বর্ষায় বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার: তিস্তা মহাপরিকল্পনা কবে?

বর্ষায় বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার: তিস্তা মহাপরিকল্পনা কবে?

উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তিস্তা নদী। লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কৃষক, জেলে ও নদীতীরবর্তী মানুষের প্রধান ভরসা এই নদী। অথচ দীর্ঘদিনেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন, আর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নদীপাড়ের মানুষকে।

বিজ্ঞাপন

তিস্তা তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা তিস্তাপাড়ের মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছি। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে হাহাকার হয়, আর বর্ষায় নদীভাঙনে মানুষ ঘরছাড়া হন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

কৃষক সফিয়ার রহমান, শহিদুল ইসলামসহ একাধিক কৃষক জানান, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির জন্য হাহাকার করতে হয়। আবার বর্ষায় তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। কখন বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, সেই শঙ্কায় দিন কাটে তাদের।

বন্যা ও নদীভাঙনের পাশাপাশি কৃষিতেও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। হঠাৎ বন্যার পানিতে ডুবে যায় ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, পাট, পেঁয়াজ, মরিচ ও রসুনসহ বিভিন্ন ফসল। গবাদিপশু নিয়েও চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। পানি বাড়লে প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িঘরে পানি উঠলে গবাদিপশু নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। অনেক সময় বসতঘর পানিতে ডুবে গেলে রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আদিতমারী এলাকার ষাটোর্ধ্ব মফিদার রহমান বলেন, ৮ থেকে ১০ বার আমার বাড়িভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিবছর নিজেকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করি, কিন্তু বর্ষা এলেই সবকিছু আবার ভেস্তে যায়। বর্ষা এলেই আতঙ্ক তৈরি হয়। কখন পানি এসে সবকিছু ডুবিয়ে নিঃস্ব করে দেবে, তা বলা মুশকিল। বছরের পর বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা শুনলেও এখন আর আশা জাগে না। কারণ, বর্ষা আমাদের সবকিছু কেড়ে নেয়।

একই এলাকার তুহিন মিয়া বলেন, প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত ও ভাঙনের শিকার হয়ে মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। শুকনো মৌসুমে কিছুটা চাষাবাদ করে ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন বর্ষায় আবার নিঃস্ব হতে হয়। এভাবেই চলছে নদীপাড়ের মানুষের জীবন।’

৪৯ কোটি টাকার বাঁধেও মিলছে না সুফল

২০২২ সালে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বন্যা প্রতিরক্ষা বেরিবাঁধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, বাঁধটি তিস্তার বন্যা ও নদীভাঙন থেকে তাদের রক্ষা করবে। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

স্থানীয়দের দাবি, তিস্তার পানি সামান্য বাড়লেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ বুকসমান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে বাঁধের পেছনের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ শেষ হয় না। বাঁধের কারণে ভেতরে ঢুকে পড়া পানি সহজে বের হতে না পারায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কৃষককে বিলম্বে জমিতে চাষাবাদ শুরু করতে হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

মহিষখোচা ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে বাঁধ তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে স্থায়ী নদীশাসনের অভাবে নদীভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি ওঠানামা করছে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা তৈরি হতে পারে। আমরা সার্বক্ষণিক নদী এলাকায় খোঁজখবর রাখছি। নদীতীরের মানুষকে বন্যা নিয়ে বিভিন্নভাবে সচেতন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ বছর বাম তীরে তেমন ভাঙন নেই। তবে ডান তীরের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভাঙন রয়েছে। গত দুই অর্থবছরে আমরা বাম তীরে ১০ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ এলাকায় রক্ষা কাজ করেছি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি জাতীয় ইস্যু। সরকার দ্রুত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন