রংপুরের পীরগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাহী কর্মকর্তা (পৌর সচিব) আব্দুর রহিম প্রামাণিকের নিয়ন্ত্রণেই চলছে সব। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে থেকে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে তার ‘অপ্রতিরোধ্য’ অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
২০১৩ সালের ২৮ আগস্ট পীরগঞ্জ পৌরসভার গেজেট প্রকাশিত হয়। এরপর নানা জটিলতা পেরিয়ে আদালতে সীমানা নির্ধারণের মামলার বেড়াজাল থেকে ২০১৫ সালে পৌরসভা মুক্ত হয়। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত পীরগঞ্জ পৌরসভার আয়তন সাত দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার। পৌরসভাটি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দলটির হয়ে এখনো পৌরসভাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন পৌর সচিব আব্দুর রহিম প্রামাণিক।
শুরু থেকেই পলাশবাড়ি পৌরসভার সচিব আব্দুর রহিম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পীরগঞ্জ পৌরসভায় দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। ২০১৬ সালে পীরগঞ্জ পৌরসভার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাসুরের ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজিমুল ইসলাম শামিম। তার সঙ্গে সখ্য তৈরি করে ধীরে ধীরে মেয়রের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন আব্দুর রহিম। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মেয়রের সঙ্গে যোগসাজশে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পৌরসভার বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলী ও কাউন্সিলররা জানান, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ উত্তোলনে আব্দুর রহিম ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। উন্নয়ন কাজের বিল ছাড় করতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ছয় থেকে সাত শতাংশ কমিশন নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন তারা। এক পর্যায়ে পীরগঞ্জ পৌরসভায় স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন আব্দুর রহিম।
২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তার পদবি পরিবর্তন হয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হয়। ২০২১ সালে তাজিমুল ইসলাম শামীম পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পৌরসভায় আব্দুর রহিমের প্রভাব আরো বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভার সব সিদ্ধান্তে পৌর সচিবের কথাই শেষ কথা হিসেবে গড়ে ওঠে আব্দুর রহিমের নিজস্ব সিন্ডিকেট। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন রংপুর আঞ্চলিক অফিসে কাজ না করেই ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের ঘটনাসহ মৃত্তিকা অ্যাগ্রো ফার্ম, মাহমুদুন্নবী কনস্ট্রাকশন, ওবায়দুল হক কনস্ট্রাকশনের জামানতের পৌনে পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা লিখিতভাবে জানানো হলে সচিবের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার চিত্র ওঠে আসে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উন্নয়ন তহবিল থেকে কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় পৌরবাসী দুদক অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বিষয়টি নিয়ে পৌরসভাবাসীদের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেনÑ তৎকালীন পৌর মেয়র তাজিমুল ইসলাম শামিম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা পৌর সচিব আব্দুর রহিম প্রামাণিক।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জনতা ব্যাংক পীরগঞ্জ শাখার একটি হিসাব থেকে একাধিক চেকের মাধ্যমে ‘মেসার্স হাফসা ট্রেডার্স’-এর নামে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এছাড়া ‘মৃত্তিকা এগ্রো ফার্ম’, ‘মাহমুদুন্নবী কনস্ট্রাকশন’ ও ‘ওবায়দুল হক কনস্ট্রাকশন’-এর জামানতের প্রায় ৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা দুদকে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করেন, নির্ধারিত নিয়ম না মেনে তাদের জামানতের চেক উত্তোলন করা হয়েছে। চেক উত্তোলনের আবেদন, স্বাক্ষর কিংবা অ্যাকাউন্ট পে বিধানও মানা হয়নি বলে অভিযোগে বলা হয়।
আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রকল্প-২-এর এক কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বিনা নোটিসে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি পৌর সচিবের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পৌর মেয়র শামীম ছিলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভাসুরের ছেলে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভাই। এই দাপটেই মেয়র ও সচিব মিলে স্পিকার শিরিন শারমিনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসে বিল ভাউচার দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এই আত্মসাতের মূল কারিগর ছিলেন পৌর নির্বাহী আব্দুর রহিম প্রামাণিক। বিষয়গুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ে এসে তদন্ত করলে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে। তারা আরো বলেন, পৌর মেয়র শামীম সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভাই হওয়ার কারণে ইচ্ছেমতো যা করেছে, সেটাই পীরগঞ্জ পৌরবাসীকে দেখতে হয়েছে। তাদের সামনে প্রতিবাদ করার কেউ সাহস পেত না।
এসব অভিযোগ তদন্তে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পপি খাতুন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, সহকারী প্রোগ্রামার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে রাখা হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পীরগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা (পৌর সচিব) আব্দুল রহিম প্রামাণিক বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। একটি কুচক্রী মহল সাংবাদিকদের বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০২২ সালের কাজের বিষয়ে কাগজপত্র না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কাজ ছাড়া কোনো বিল উত্তোলন বা পরিশোধ করা হয়নি। বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত হয়েছে এবং আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

