উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের জীবন-জীবিকার চালিকাশক্তি তিস্তা নদী। এই নদীর ওপর নির্ভরতা এ অঞ্চলের কৃষক, জেলে, মাঝি ও সাধারণ মানুষের জীবনরেখা। নদীর উজানে থাকা ভারতের আগ্রাসনে স্বাধীনতার ৫৪ বছর ধরে তিস্তার ভাঙনে প্রতি বছর বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে হাজার হাজার পরিবার। ঘরছাড়া হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
বিগত সরকারগুলো দফায় দফায় তিস্তার পানি চুক্তি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বললেও কোনো সরকার তা বাস্তবতার মুখ দেখাতে পারেনি। এ কারণে ক্ষোভ এবং হতাশায় ভুগছেন তিস্তা পাড়ের লাখ লাখ মানুষ। এবার তিস্তাপাড়ের মানুষ তাদের প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের কাছে আশ্বাস নয়, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান তারা।
নির্বাচন এলেই তিস্তাপাড়ের মানুষদের ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর দৌড়ঝাঁপ শুরু বেশ পুরোনো। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেওয়া হয় বারবার, ভোটশেষে এ পাড়ের মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়। এভাবেই কয়েক দশক ধরে প্রতারিত হচ্ছে তিস্তা নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। এবার অন্তত ব্যতিক্রম হবে এমন প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছেন তারা।
তিস্তার অববাহিকায় উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার ১৮৫ কিলোমিটারজুড়ে দুই কোটি মানুষের বসবাস। নদীর উজানে থাকা ভারত একাধিক বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এ কারণে বাংলাদেশ অংশে শুষ্ক মৌসুমে ১৮৫ কিলোমিটার নদী শুকিয়ে ধুঁধুঁ বালুচরে পরিণত হয়। আর এতে হাজার হাজার একর ফসলি জমি চাষাবাদে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে।
এছাড়া মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণ। এতে উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় অকাল বন্যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী হাজার হাজার বসতবাড়ি ভেসে গিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে এ অবস্থা বিরাজ করছে।
এদিকে, আগামী জুনে তিস্তার তীরবর্তী লাখ লাখ মানুষ বন্যা আতঙ্কে ভুগছেন। কারণ, জুনের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারেজের গেট দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ জনপদ পানিতে ভাসিয়ে দেয়।
জানা যায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ বারবার তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করে কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়। ভারত প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অজুহাতে পানি দিতে ব্যর্থ হলে ২০১০ সালে তিস্তা ঘিরে মহাপরিকল্পনার চিন্তা করে সরকার।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের সঙ্গে সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়। ২০১৯ সালে চীনের ‘চায়না পাওয়ার’ কোম্পানি সমীক্ষা শেষ করে একটি প্রকল্প তৈরি করে পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা দেয়। আট হাজার ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি চুক্তি স্বাক্ষর হলে ২০২০ সালে কাজ শুরু করে ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। চায়না পাওয়ার কোম্পানি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা এবং ভারতের বাধার মুখে সেটি আলোর মুখ দেখেনি।
জুলাই বিপ্লবে হাসিনা সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা নদী ঘিরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। তারা প্রতিশ্রুতি দেয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করবে সরকার। ১২ হাজার কোটি টাকায় ১০ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে সরকারের প্রাথমিক আলোচনা হয়। যার প্রথম ভাগে পাঁচ বছর মেয়াদি ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের অর্থ ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের কাছে ঋণ নেওয়া হবে। আর বাকি দুই হাজার ৪১৫ কোটি টাকা সরকার জোগান দেবে।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসান এবং চীনা রাষ্ট্রদূত তিস্তাপাড় পরিদর্শনে এসে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন তিস্তা প্রকল্প চীনে পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য যাচাই শেষে এ বছর কাজ শুরু করা হবে। প্রকল্পের ঋণের অর্থ ছাড়ে চীন ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তাদের মনোভাব নতুন সরকারের সঙ্গে তারা এটি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
এদিকে, তিস্তাপাড়ের মানুষ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের লালফিতার দৌরাত্ম্যে আস্থাহীনতায় ভুগছেন। এ থেকে এলাকার মানুষ তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলনের রূপ দেয়। গত বছরের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি তিস্তাপাড়জুড়ে মানুষ নদীতীরে অবস্থান নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানায়।
যদিও পরবর্তী সময়ে আন্দোলনটি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নেয়। সেই সমাবেশে ভার্চুয়াল বক্তব্য দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দেন। এই আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও অবহেলিত ছিল, এই সরকারের আমলেও কি তাই? এই প্রশ্ন এখন তিস্তাপাড়ের মানুষের। তাদের আশা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ সৃষ্টি হবে, ঘুচবে বেকারত্ব ।
অন্যদিকে, জানা গেছে সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা বাঁধে পানির চাপ দ্রুতই বাড়ছে। দেশটির পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল যেকোনো সময় বাংলাদেশে প্রবেশ করে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, তিস্তার পানি সামান্য বাড়লেও আপাতত তেমন বন্যার শঙ্কা নেই।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তার পানি যৎসামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, আপাতত বন্যার কোনো শঙ্কা নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিশ্ববাজার অস্থির তেলের দামে