বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ আইন কমিশন গঠন করলেও কমিশনের নানা যুগান্তকারী সুপারিশের বেশির ভাগই আমলে নেয়নি তারা। ১৯৯৬ সালে আইন কমিশন গঠনের পর গত ৩০ বছরের তিন ভাগের প্রায় দুই ভাগ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু কমিশনের প্রস্তাবিত বেশির ভাগ সুপারিশই ফাইলবন্দি করে রাখা হয়। মাসের পর মাস গবেষণা আর লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে সুপারিশগুলো তৈরি করা হলেও এগুলোর বেশির ভাগই দেখেনি আলোর মুখ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কল্যাণে প্রতিনিয়ত বিশ্ব যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনো পড়ে আছে ব্রিটিশ আমলের নানা আইনকানুন নিয়ে। এসব পুরোনো আইন যুগোপযোগী করতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে আইন কমিশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত আইন সংশোধন, সংস্কার এবং নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশের জন্য একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও, কমিশনের সুপারিশগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ায় ‘ফাইলবন্দি’ থাকছে।
আইন কমিশন সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৬৯টি আইন যুগোপযোগী করার সুপারিশ করলেও মাত্র আটটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অথচ একেকটি সুপারিশ তৈরি করতে কমিশনের মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে। গবেষণা কাজ পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে লাখ লাখ টাকা।
আইন কমিশনের সাবেক একজন সদস্য আমার দেশকে বলেন, কমিশনের তৈরি অধিকাংশ সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয় কিংবা সরকার শেষ পর্যন্ত আমলে না নেওয়ায় জনগণ সেগুলোর সুফল পায় না। একটি আইন প্রণয়নের আগে অনেক গবেষণা, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা ও ভিজিট করা হয়। তার মতে, যেসব উচ্চমানের গবেষণা কমিশনে হচ্ছে, এগুলোর রিসার্চ ভ্যালু আছে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আদৌ এগুলো কাজে লাগানো হয়েছে কি না কেউ জানে না। সাক্ষী সুরক্ষা, বৈষম্য বিলোপ, মিথ্যা মামলা প্রতিরোধ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, চিকিৎসায় অবহেলা দূর, শারীরিক শাস্তির বিধান বাতিলসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে প্রতিবেদন দিয়েছিল আইন কমিশন। কিন্তু এসব সুপারিশের শেষ পর্যন্ত কী হয়, তাও কমিশনকে জানানো হয় না।
সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকের মতে, ‘উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের প্রধান পার্থক্য হলো—তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও কার্যকর, আমাদেরগুলো নয়। যে দেশের প্রতিষ্ঠান যত কার্যকর ও শক্তিশালী, সে দেশ সংকট মোকাবিলায় ততটাই পারদর্শী। আর আমাদের দেশে সবকিছুই রাজনীতিকরণ করা হয়। অতীতে প্রায়শই শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইন কমিশনের সর্বশেষ চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, যিনি সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়েছিলেন এবং তার এমন রায়ের পুরস্কারস্বরূপ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে আইন কমিশনে নিয়োগ দেয়। একইভাবে কমিশনের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিরোধী দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে ওই পদে নিয়োগ পান। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এ ধরনের ব্যক্তিরা সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কাজ করেন না।
তিনি আরো বলেন, আইন কমিশন আইন, ১৯৯৬-এর ধারা ৬(ক)(৪) অনুযায়ী, কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বিদ্যমান বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার প্রতিরোধে সুপারিশ করা। কিন্তু আমরা দেখেছি, বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে কীভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিচারব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এসব বিচারিক অনিয়মের বিষয়ে আইন কমিশনের কোনো ধরনের ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়নি। অতএব, এই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের ধারা এবং বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে অর্থবহ পদক্ষেপের অভাব—এই দুইয়ের ফলেই আইন কমিশনের মতামত ও পর্যবেক্ষণগুলো অনেকাংশে গুরুত্বহীন ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। তবে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত আইন কমিশন তুলনামূলকভাবে স্বাধীন এবং বিভিন্ন আইন নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যদিও তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সংঘটিত অতীত অবিচার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের ভূমিকা—এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি।
যতক্ষণ না আইন কমিশন বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে সক্ষম হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত অর্থে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল বেশির ভাগ দেশে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনের সংস্কারে তাদের আইন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ ল কমিশন বা ভারতের আইন কমিশন খুব কার্যকর সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্যে পৃথক আইন কমিশনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি আলাদা ইউনিফর্ম ল’ কমিশন আছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি বলেছেন, গত দুই যুগে ১৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ করে আইন কমিশন ১৬৯টি আইনের সুপারিশ করলেও গৃহীত হয়েছে মাত্র আটটি। প্রতি বছর ৮-১০ কোটি টাকা জনগণের অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত ফল আসছে না। এটি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।
সার্বিক বিষয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি জিনাত আরার দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে কমিশন সূত্র জানায়, গত ১৮-১৯ এপ্রিল বাল্যবিবাহ নিরোধক আইন এবং নারী ও শিশু আইনের বিভিন্ন অসংগতি নির্ধারণে মতবিনিময় করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি অর্থঋণ আদালতের বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করতেও কাজ করা হয়েছে। আইন কমিশনের প্রতিবেদন প্রতিফলিত হয়েছে এমন কিছু আইন হলো ট্রেডমার্ক বিষয়ক আইন, কপিরাইট আইন, তথ্য অধিকার আইন, আইনগত সহায়তা প্রদান বিষয়ক আইন ইত্যাদি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন কমিশনের সুপারিশ কাজে না আসার মূল কারণ হলো আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। আইন কমিশনের সুপারিশগুলোকে কার্যকর করতে হলে সুপারিশ বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে আইন কমিশন আইন সংশোধন করে কমিশনের সুপারিশগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপন বা বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শ্রমিক অসন্তোষে ফায়দা লুটতে সক্রিয় স্বার্থান্বেষী মহল