উড়োজাহাজ ও পাইলট স্বল্পতা

আন্তর্জাতিক রুটে গন্তব্য বাড়াতে পারছে না বিমান

কবিতা
কবিতা

আন্তর্জাতিক রুটে গন্তব্য বাড়াতে পারছে না বিমান

বহরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উড়োজাহাজ না থাকায় এবং পাইলট স্বল্পতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক রুটে গন্তব্য বাড়াতে পারছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বিশ্বের ৭০টি দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটির। বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ দিয়ে ২০টি আন্তর্জাতিক এবং সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান।

উড়োজাহাজ সংকটে গত কয়েক বছর ধরে হজ ফ্লাইট পরিচালনার সময় নিয়মিত রুটগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যাত্রী সামলাতে গিয়ে অনেক সময় কয়েকটি রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিতে হয়, এমনকি দু-একটি রুট সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়। ’৭২ সালের ৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এভাবেই অতিক্রম করেছে দীর্ঘপথ।

বিজ্ঞাপন

বিমান সূত্র জানায়, ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মেটাতে বিমানের বহর আধুনিকায়ন এবং দীর্ঘ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে ১৪টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন জেনারেশনের বোয়িং কেনার চুক্তি করে বিমান। বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ও চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট কেনা হবে। এজন্য ব্যয় হবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন রুটে ব্যবহারের জন্য ৭৮৭-১০ মডেলের আটটি, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা রুটে ব্যবহারের জন্য ৭৮৭ -৯ মডেলের দুটি এবং মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রুটে চলাচলের জন্য প্রথমবারের মতো ৭৩৭-৮ মডেলের চারটি ম্যাক্স জেট কিনছে বিমান।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশকে অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছি। যত দ্রুত সম্ভব থার্ড টার্মিনাল চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও নতুন রুট সিডনি, নিউ ইর্য়ক পরিচালনারও পরিকল্পনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই উড়োজাহাজগুলো বিমানের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পরিচালন দক্ষতা উন্নত এবং আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক আরো বিস্তৃত করবে। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি আধুনিক উড়োজাহাজ।

বিমান সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে জাপানের নারিতা রুটটি পুরোনো। ১৯৭৯ সালে রুটটি চালু করেছিল বিমান। ১৯৮১ সালে সাময়িক বিরতি দিয়ে আবারও চালু হয় ২০০৬ সালে। অলাভজনক হওয়ায় রুটটি আবারও বন্ধ করে দেয় বিমান কর্তৃপক্ষ। ১৭ বছর পর গত ১ সেপ্টেম্বর রুটটি চালু করা হয়। প্রতিমাসে ১০ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় বিমান আবারও রুটটি বন্ধ করে দেয়। জাপানের নারিতায় বিমান একমাত্র সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে। সরাসরি ফ্লাইটের কারণে টিকিটের দাম বেশি হওয়ায় যাত্রীরা অন্যান্য এয়ারলাইনস বেছে নেওয়ায় বিমানের টিকিটে বিক্রি কমে যায়। তবে বর্তমান সরকার নারিতা রুটটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুর নির্দেশ দিয়েছে। যাত্রী ও চাহিদা বেশি থাকায় কোনো কোনো রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে সংস্থাটি। পাশাপাশি রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তারা। গত দুই বছরে চালু হয়েছে টরেন্টো রুট। যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহে কারণে রুটটি নিয়ে খুবই আশাবাদী ছিল বিমান কর্তৃপক্ষ। তবে শুরু থেকেই রুটটি লাভজনক রুটে পরিণত হয়েছে। ফ্লাইটটির আসা-যাওয়া মিলে ৯০ শতাংশ আসনে যাত্রী। জানা গেছে, আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে এই রুটে ফ্লাইট বৃদ্ধি করবে বিমান। সপ্তাহে শনি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার তিনটি ফ্লাইট চলবে নারিতায়।

২০২২ সালে চীনের গুয়াংজুতে যাত্রা শুরু হয় বিমানের ফ্লাইট। মাঝে বিরতি দিয়ে ২০২৩ সাল থেকে পুনরায় যাত্রী ও কার্গো পরিবহন করছে সংস্থাটি। প্রচুর বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী এই ফ্লাইটে যাতায়াত করে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, এ রুটটি ব্যবহার করছে ৮১ শতাংশ। বাড়ছে কার্গোর চাহিদাও। ফলে এই রুটটি লাভজনক।

ঢাকা-রোম ফ্লাইট চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে এই রুটে বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়। মাত্র ৯ ঘণ্টায় ঢাকা হয়ে ইতালির রাজধানী রোমে পৌঁছানোর জন্য বিমান সপ্তাহে তিনদিন সোম, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ফ্লাইট পরিচালনা করে। এ রুট জনপ্রিয় করতে আল ইটালিয়ানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিমান। এর মাধ্যমে মিলান, নেপোজ ও ভেনিস এবং ফ্রাংকফুর্টের সংগে যুক্ত করা হবে। এ রুটগুলো লাভজনক হবে বলে আশা করছে বিমান।

ঢাকা-নিউ ইয়র্ক রুট নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রচুর আগ্রহ থাকলেও লোকসানের কারণে এ রুটটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবারও চালুর চেষ্টা চলছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল সংস্থা নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতার কারণ দেখিয়ে সেগুলো সংশোধন করার উদ্যোগ নিতে বলেছে বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশনকে। এরপর ১৮ বছর শেষ হয়ে গেছে। ২০২০ সাল থেকে বিমান আবার চেষ্টা শুরু করে। ২০২৩ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অডিটে আসলেও বাংলাদেশের সিভিল অ্যাভিয়েশনকে আরো কিছু বিষয় সংশোধন করতে বলে। ফলে তারা ক্যাট-টুতেই রয়ে যায়। নিউ ইয়র্কে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশনকে ক্যাট-ওয়ানে আসতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, আমাদের উড়োজাহাজ প্রস্তুত। সিভিল অ্যাভিয়েশন আপগ্রেড করা হলে চালু হবে নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট।

সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে মালদ্বীপের মালে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রুটে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ২০২৮ সালে চীনের কুনমিং ও বাহরাইন এবং ২০২৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল রুটে বিমান ডানা মেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন রুট নির্বাচনের ক্ষেত্রে যাত্রী চাহিদাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুনমিং রুটে চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, বাহরাইন রুটটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারকেন্দ্রিক। সিডনি, সিউল ও জাকার্তা রুটে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উচ্চ আয়ের পর্যটক টার্গেট। এছাড়া মালে ও ইয়াঙ্গুন রুটে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের এবং নিউইয়র্ক রুটে প্রবাসী বাংলাদেশি ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতই হবে আয়ের প্রধান উৎস।

এয়ার ইন্ডিয়া

একসময় ভারতের পতাকাবাহী বিমান পরিবহন সংস্থা ছিল এয়ার ইন্ডিয়া। টাটা ২০১৯ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার শতকরা ৭৫ ভাগ এবং সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার কিনে নেয়। এয়ার ইন্ডিয়ার ১০২টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যস্থলে এয়ারবাস ও বোয়িং বিমানের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। এয়ার ইন্ডিয়া ১৮.৬% বাজার দখলের সঙ্গে ভারত থেকে ভারতের বাইরে ফ্লাইট পরিচালনাকারী সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা।

৪৭০টি উড়োজাহাজ কিনছে এয়ার ইন্ডিয়া

নয়াদিল্লির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে তৎপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। সে সূত্র ধরে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ২২০টি উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তিবদ্ধ হয় এয়ার ইন্ডিয়া। একই সঙ্গে ফ্রান্সের এয়ারবাস কোম্পানি থেকে কেনা হবে ২৫০টি উড়োজাহাজ।

চুক্তির মাধ্যমে ভারতের একক কোম্পানি হিসেবে ক্রয়ের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল এয়ার ইন্ডিয়া। চুক্তি মোতাবেক বোয়িং সরবরাহ করবে ১৯০টি ৭৩৭ এমএএক্স, ২০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ১০টি মিনি জাম্বো ৭৭৭ এক্স উড়োজাহাজ।

অন্যদিকে এয়ারবাস কোম্পানি থেকে নেওয়া হবে ২১০টি ন্যারোবডি এবং ৪০টি ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ। পরবর্তীতে আরো ২৫ জেট সরবরাহ করবে এয়ারবাস। সব মিলিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজ কেনার সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৯৫। ফ্লাইটগুলো বিশ্বজুড়ে দীর্ঘতম রুটে পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিক এবং বর্তমান আকাশপথের প্রসারকে কাজে লাগাতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। সেদিকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এয়ার ইন্ডিয়ার নতুন সিইও ক্যাম্পবেল উইলসন।

শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস

২০২৬ সালের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস ২৩-২৫টি এয়ারবাস উড়োজাহাজের বহর পরিচালনা করে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপকে কেন্দ্র করে ২১টি দেশের ৩৫টিরও বেশি সরাসরি গন্তব্যের সঙ্গে কলম্বোকে সংযুক্ত করে। এয়ারলাইনসটি ওয়ানওয়ার্ল্ড জোটের সদস্য এবং অংশীদারদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এক হাজারটিরও বেশি শহরে এর পরিধি প্রসারিত করেছে। দূরপাল্লার ফ্লাইট সক্ষমতা বাড়াতে এয়ারলাইনসটি সম্প্রতি একটি এয়ারবাস এ৩৩০-২০০ যুক্ত করেছে, যেটিতে ১৮টি বিজনেস এবং ২৪২টি ইকোনমি আসন রয়েছে। এয়ারলাইনসটি চেন্নাই, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালুরু, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর এবং লন্ডনের হিথ্রোর সঙ্গে ব্যাপক সংযোগ স্থাপন করেছে। এয়ারলাইনসটি কোডশেয়ারের মাধ্যমে ১৬০টি দেশের ১১৪টিরও বেশি গন্তব্য এবং এক হাজারেরও বেশি শহরে পৌঁছেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন