রৌমারীতে পশুর হাটে থামছেই না অতিরিক্ত টোল আদায়

উপজেলা প্রতিনিধি, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)

রৌমারীতে পশুর হাটে থামছেই না অতিরিক্ত টোল আদায়
ছবি: আমার দেশ

আসন্ন ঈদ উল আজহাকে ঘিরে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার প্রধান দুটি পশুর হাটে সরকারি নির্দেশনা ও নীতিমালা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত টোল আদায় না থামার অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ টোল আদায়ের পেছনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৯টি হাট-বাজার ইজারা দরপত্রের মাধ্যমে আহ্বান করা হয়। এতে ১৭টি হাটবাজার ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রধান দুটি হাট দুটি পশুর হাট রৌমারী উপজেলা সদরে ও যাদুরচর ইউনিয়নের কর্তিমারী হাট। রৌমারীতে পশুর হাট সপ্তাহের শুক্রবার ও সোম বার, কর্তিমারী বাজারে বুধবার ও শনিবার বসে।

বিজ্ঞাপন

আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে উপজেলার এই প্রধান দুটি হাটে পশুর বিক্রয়ে অতিরিক্ত টোল আদায় ধামছেই না। স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের দাবি হাটের ইজারাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে প্রশাসন এই অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করছে।

শুক্রবার রৌমারী পশুর হাটে দেখা যায়, গেলো বাংলা সালের টোল আদায়ের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি গরু, মহিষ ও ঘোড়ার টোল ৫০০ টাকা এবং প্রতিটি ছাগল ও ভেড়ার টোল ২৫০ টাকা নির্ধারিত। সরকারি নির্ধারিত টোল নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রৌমারী পশুর হাটে প্রতিটি গরু, মহিষ ও ঘোড়ার বিক্রয়ের টোল ৫০০ টাকার না নিয়ে ৮০০ টাকা এবং ছাগল-ভেড়ায় ২৫০ টাকা না নিয়ে ৪০০ টাকা টোল আদায় করছেন হাট-বাজার ইজারাদার। এছাড়া বেশিভাগ ফাঁকা রশিদ দেওয়া হচ্ছে ।

সরেজিমেন দেখা যায়, শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে রৌমারী পশুর হাট তদারকি করতে আসেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান । তিনি পশুর হাটে আসার আগ থেকেই অতিরিক্ত টোল আদায় করা হয়েছে। তার উপস্থিতিতে সাময়িক বন্ধ ছিল অতিরিক্ত টোল আদায়। এসময় কাজিউল নামের এক সরকারের নগদ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

বুধবার একই চিত্র দেখা যায় কর্তিমারী হাটবাজারে। এখানেও প্রতিটি গরু, মহিষ ও ঘোড়ার বিক্রয়ের টোল ৫০০ টাকার না নিয়ে ৮০০ টাকা ও ছাগল-ভেড়ায় ২৫০ টাকা না নিয়ে ৪০০ টাকা টোল আদায় করছেন ইজারাদার। কর্তিমারী বাজারে পশুর হাটেও ফাঁকা রশিদ দেওয়া হয়।

স্থানীয় প্রসাশানস সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১২ মে) মাসিক আইন-শৃঙ্খলা সভায় রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলাউদ্দিন ১৪৩২ সালের টোল আদায়ের সরকারি নীতিমালা উল্লেখ করে জানান প্রতিটি গরু, মহিষ ও ঘোড়ার টোল ৫০০ টাকা এবং প্রতিটি ছাগল ও ভেড়ার টোল ২৫০ টাকা নির্ধারিত। আইনশৃঙ্খলা সভায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে হাটে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়টি উত্থাপন করা হলে, ইউএনও ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিজের মনগড়াভাবে প্রতি গরু-মহিষে ৭০০ টাকা এবং ছাগল-ভেড়ায় ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে টোল আদায়ের মৌখিক অনুমতি দেন। কিন্তু ইজারাদাররা তাও না মেনে গরু-মহিষে ৮০০ টাকা এবং ছাগল-ভেড়ায় ৪০০ টাকা আদায় করছেন।

জানা গেছে, গত বছর রৌমারী সদর হাট-বাজারটির ইজারা মূল্য ছিল সাড়ে ৩ কোটি টাকা। কিন্তু এবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বিএনপির আহ্বায়ক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক তার ছেলে শাকিল আহমেদের নামে প্রায় ৬ কোটি টাকায় হাটটি ইজারা নেন। বিশাল অঙ্কের এই বিনিয়োগের টাকা তুলতে হাট ইজারা নিয়েই প্রতিটি গলি পূর্বের তুলনায় ৩ গুন ৪ গুন মূল্যে বিভিন্ন সাব-ইজারাদারের কাছে ইজারা দেওয়া হয়।

কর্তিমারী হাটবাজার প্রায় ৭২ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নেন এমদাদুল হক মন্ডল।

গত এক সপ্তাহে রৌমারীর পশুর হাটের এই নৈরাজ্য ও গণহারে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে জনরোষ এড়াতে ইউএনওর নির্দেশে হাট তদারকি করতে যান সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এসি ল্যান্ডের এই তদারকি ছিল নিছকই ‘লোকদেখানো’।

হাটে আসা এক গরু ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) যখন হাটে আসেন, তখন কেবল তার সামনের একটি টেবিলে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত টোল নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই টেবিলের আশপাশের অন্য সব টেবিলে নির্বিঘে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছিল। এসি ল্যান্ডের চোখের সামনেই এই অনিয়ম ঘটলেও তিনি কোনো আইনি ব্যবস্থা বা জরিমানা করেননি।

কবির নামের এক ক্রেতা জানান, তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা (মোট ৮০০ টাকা) খাজনা রাখা হলেও আদায়কৃত চালানে কোনো টাকার অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি।

ফুলমিয়া নামের এক ক্রেতা বলেন, আমি একটি ছাগল ক্রয় করেছি। আমার কাছে খাজনা বাবাদ ৪০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। খাজনার রশিদে দেখা যায় ক্রেতা-বিক্রেতার নাম থাকলেও নেই খাজনা আদায়ের পরিমাণ।

ইজারাদারের দায়িত্বে থাকা রৌমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত বছরের মতো এবারও টোল নিলে হাটে লোকসান গুনতে হবে। তাই কিছুটা টোল বাড়ানো হয়েছে।

কর্তিমারী হাটড়বাজারের ইজারাদার এমদাদুল হক মন্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল নাম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আলাউদ্দিন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়টি অবগত হয়ে এসি ল্যান্ডকে হাটে পাঠানো হয়েছিল। আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর গরুতে ৬০০ টাকা ছিল এবার ১০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি। এ সিদ্ধান্ত আমার একার নয়। তারপর এটা শুধু ঈদের জন্য করা হয়েছে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন