ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময়

দাশিয়ারছড়া: এক যুগেও কাটেনি বৈষম্য

দাশিয়ারছড়া: এক যুগেও কাটেনি বৈষম্য
ছবি: আমার দেশ

আজ এক যুগে পদার্পণ হলো ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময়। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে বিগত ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও কুড়িগ্রামের সাবেক ছিটমহলগুলোতে প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

নাগরিক পরিচয় মিললেও জীবিকার নিশ্চয়তা, শিল্পায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা- প্রশিক্ষণের অভাবে এখনো বৈষম্যের শিকার বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

মোজাফফর আলীর বয়স পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই। ছিটমহল বিনিময়ের আগে দিন মজুরের কাজ করতেন দিল্লির বিভিন্ন ইটভাটায়। আর এখন জীবিকার তাগিদে ঢাকাতে ছুটে যেতে হয় রিকশা চালাতে। এলাকায় কাজ না থাকায় এ বয়সেও তাকে টানা চার-পাঁচ মাস পরিজন ছেড়ে একা ঢাকায় থাকতে হয়।

তিনি বলেন, ‘কি আর কং বাহে, হামার কপালোত আগোত যা আইছল, এলাও তা। এটি কলকারখানা নাই, যে কয়টা দোকানপাট আছে তাতে লোক লাগে না।’

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশার অবসান ঘটে দাসিয়ারছড়া ছিটমহলবাসীর। ওই দিন ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের সঙ্গে এবং ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়। এর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয় মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি। বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভের মাধ্যমে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন হাজারো ছিটবাসী।

কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি সড়ক, বিদ্যুৎ ও সরকারি সেবার কিছু উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকায় এখনো গড়ে ওঠেনি উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, দিনমজুরি ও মৌসুমি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল।

সদ্য কলেজ পাশ করা মইনুল ইসলাম জানালেন, ‘ছিটমহলে অনেক শিক্ষার অভাব। বিশেষ করে অভাব কারিগরি ও আইসিটি শিক্ষার। তার দাবি, পাঁচ বছর আগে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকার যে আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে, সেটিকে দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। তিনি আরও জানালেন, এখানে নারী শিক্ষার হার কম। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা করার মতো কোনো মাঠ নেই। নেই শিশুদের বিনোদনের স্থান। তাই যুবসমাজে মাদকে আসক্তির শঙ্কার কথাও জানালেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি উদ্যোগে একটি আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হলেও সেটি প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার তরুণ-তরুণীরা।

তাদের দাবি, বন্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দ্রুত চালু করার পাশাপাশি কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। শিক্ষা খাতেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার বেশি। উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক তরুণ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন।

এই এলাকার প্রায় ৮ হাজারেরও বেশি বাসিন্দার জন্য কাগজেকলমে ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মাত্র ১টি দৃশ্যমান। যেখানে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সেখানকার কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোপাইটার (চিকিৎসক) মিনহাজুল ইসলাম জানালেন, বাকি দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবকাঠামোগত অস্তিত্ব নেই। আর যদি এখানে হাসপাতাল হয়, তাহলে স্থানীয় মানুষজন ভালো চিকিৎসাসেবা পাবে।

ছিটমহলবাসীর দাবি, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ ছাড়া ছিটমহলবাসীর জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারা সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

এদিকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আফজাল হোসেন জানান, এখান থেকে কোনো কাজ করতে গেলে যাইতে হয় সেই ফুলবাড়ী। এখানে একটা ইউনিয়ন পরিষদ হলে আমাদের অফিসের কাজের আরো সুবিধা হবে।

এ বিষয়ে ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা আকতার জানান, এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন