সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশি হত্যা, ধরে নিয়ে যাওয়া, নির্যাতন এবং শূন্যরেখা বরাবর কাঁটাতারের বেড়া ও ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের চেষ্টা বন্ধই হচ্ছে না। গত ৮ বছরে শুধু লালমনিরহাট সীমান্তেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ বাংলাদেশি। সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দিলেও কথা রাখেনি বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্তে এমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটিও বিচার হয়নি।
দহগ্রাম সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজার মতে, মাথা উঁচু করে সীমান্ত হত্যার কড়া জবাব দিতে না পারলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ভারতকে লিখিতভাবে অভিযোগ করে অফিসিয়ালি জবাব চাইতে পারে বাংলাদেশ। যদি এতে সমাধান না হয়, তাহলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। দেশি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সীমান্ত সূত্রে জানা যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় লালমনিরহাট সীমান্ত পথে গবাদিপশু পাচার,আত্মীয়র সঙ্গে দেখা বা ভালো কাজের খোঁজে দুই দেশের মানুষ সীমান্ত পারাপার করে থাকে। শূন্যরেখার কাছে কৃষিকাজ কিংবা মৎস্য আহরণের জন্যও অনেককে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়। ভুল করে কেউ ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গেলে বা অরক্ষিত সীমান্ত সামান্য অতিক্রম করলেই শুরু হয় বিএসএফের আগ্রাসী তৎপরতা। সীমান্তে চোরাচালান ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধের কারণ দেখিয়ে বিএসএফের বিতর্কিত শুট অন সাইট (দেখামাত্র গুলি) নীতি সীমান্তে বহাল রয়েছে।
বিগত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন সহ্য করতে না পেরে ভারত বাংলাদেশের ওপর যেন আরো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। হাসিনা-মোদি মিলে অন্তর্বর্তী সরকারকে শুরু থেকেই ব্যর্থ করে দেওয়ার বহু ষড়যন্ত্র করেছেন। সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলে বাংলাদেশকে নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা থেকে শুরু করে নানাভাবে হুমকি দিয়েছে।
সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও থেমে নেই বিএসএফের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা। পতাকা বৈঠকেই সীমাবদ্ধ সমাধানের পথ। সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারত বারবার আশ্বাস দিলেও সেটার বাস্তবায়ন শূন্যের কোঠায়। বিএসএফ গুলি করে বাংলাদেশি হত্যা, ধরে নিয়ে যাওয়া ও নির্যাতন এবং শূন্যরেখা বরাবর কাঁটাতারের বেড়া ও ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের চেষ্টা যেন বন্ধই হচ্ছে না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা ছিটমহল সমস্যার সমাধান হওয়ার পর বিএসএফের সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে। কিন্তু অতিসম্প্রতি পত্রিকার পাতা ওল্টালেই দেখা যাচ্ছে সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি খুন হয়েছে বা বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের কিছু মানুষ ভারতের গরু পাচার করে জীবিকা নির্বাহ করে এ কথা সত্য। ভারত সম্প্রতি গরু পাচার বা রপ্তানির ব্যাপারে কঠোর হওয়ায় ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ হচ্ছে না।
প্রতিবারই বিএসএফ বলছে আর গুলি চালাবে না
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে লালমনিরহাটসহ সারা দেশে অন্তত ৬০৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অধিকার নামের একটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যদের হাতে অন্তত ৫৮২ বাংলাদেশি নিহত এবং ৭৬১ জন আহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ২৬ জুন কালীগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন নূরুল ইসলাম (৫৫) । ভোরে কালিগঞ্জ উপজেলার লোহাকুচি সীমান্তের ৯১৯ নং মেইন পিলারের কাছে এ ঘটনা ঘটে। ২৬ জুন হত্যা করা হয় পাটগ্রাম উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া সীমান্তে আবুল কালামকে (২৫)। ২৯ জানুয়ারি দহগ্রাম সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে নিহত হন রবিউল ইসলাম টুকলু নামের এক যুবক।
২০২৩ সালের ৭ জুলাই দুর্গাপুর সীমান্তে কলাগাছের ভেলায় করে বাংলাদেশি এক যুবকের লাশ পাঠায় ভারত। ২ এপ্রিল বিএসএফের গুলিতে পাটগ্রাম সীমান্তে এক রাখাল নিহত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি কালীগঞ্জের বুড়িরহাট সীমান্তে বিএসএফের নির্যাতনে সুমন (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। ১ জানুয়ারি বুড়িমারী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বিপুল মিয়া (২৩) নামে বাংলাদেশি এক রাখাল নিহত হয়।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর হাতীবান্ধা উপজেলার দোলাপাড়া সীমান্তে দুই বাংলাদেশি তরুণ নিহত হয়। ১৫ ডিসেম্বর পাটগ্রাম সীমান্তে গুলিতে শাহাদাত হোসেন (২৯) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হন। ২৭ নভেম্বর হাতীবান্ধায় বিএসএফের নির্যাতনে সাদ্দাম হোসেন (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ৯ নভেম্বর লালমনিরহাটের লোহাকুচি সীমান্তে বিএসএফের ছোড়া গুলিতে দুই বাংলাদেশি রাখাল নিহত হয়েছেন। ২০২২ সালের ১৭ মার্চ পাটগ্রামের ভেরভেরির হাট শমসেরনগর সীমান্তের ওপারে ভারত ভূখণ্ডে বিএসএফের নির্যাতনে রেজাউল ইসলাম নিহত হন।
এদিকে ২০২১ সালে ৮ জন, ২০২০ সালে ৭ জন, ২০১৯ সালের দুজন, ২০১৮ সালে ৩ জন ও ২০১৭ সালে ৭ জন বিএসএফের ছোড়া গুলিতে নিহত হয়েছেন।
বিএসএফ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে সীমান্ত সম্মেলন বা পতাকা বৈঠক হয়। এমনকি বিএসএফ বা ভারত সরকার হত্যাকাণ্ডের কোনো ঘটনায় কখনো উদ্বেগও প্রকাশ করেনি। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জবাবদিহির বাইরে থাকার কারণেই মূলত সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো বাহিনীকে বিশ্বের কোথাও নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের গুলি বা নির্যাতন করার অনুমতি দেয় না। প্রতিবারই সীমান্তে আর গুলি চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয় বিএসএফ। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা হয় না। এসব হত্যাকাণ্ডের একটিরও বিচার হয়নি।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট (১৫ বিজিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহ্ মো. শাকিল আলম, এসপিপি বলেন, সীমান্তে কে কি কারণে হত্যার শিকার হয়েছে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আন্তর্জাতিক স্থল সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বে পঞ্চম বৃহত্তম। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড শূন্যে নামাতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন। এই যৌথ বিবৃতির পরও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড আজও বন্ধ হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

