কৃষিজমি ধ্বংস করে পঞ্চগড়ে চলছে পাথর উত্তোলন

হোসেন রায়হান, পঞ্চগড়

কৃষিজমি ধ্বংস করে পঞ্চগড়ে চলছে পাথর উত্তোলন
পঞ্চগড়ে কৃষিজমি ধ্বংস করে পাথর উত্তোলনে ব্যস্ত শ্রমিকরা। আমার দেশ

উন্নয়ন কাজে পাথরের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষিজমি ধ্বংস করে পঞ্চগড়ে চলছে পাথর উত্তোলন। এতে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। কমছে কৃষি উৎপাদন।

জানা গেছে, ভূগর্ভস্থ পাথর দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করছে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে মাটি খনন করে পাথর উত্তোলন ছাড়াও রাতের আঁধারে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়াও শিল্প কলকারখানা করার নামে মহাসড়কের দুই ধারের জমি ক্রয় করে ফেলে রাখাসহ চা বাগানের জন্য জমি কিনে নিচু জমি ফেলে রাখায় পঞ্চগড়ে আবাদি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া উপজেলায় এর প্রভাব অনেক বেশি। এখনি সঠিক উদ্যোগ না নিলে আগামীতে এ উপজেলার কৃষিজমি অর্ধেকে নেমে আসবে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।

বিজ্ঞাপন

সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ার মোট আয়তন ১৮৯ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার। মোট জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৯১২ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমি ১৪ হাজার ৮৩৯ হেক্টর, স্থায়ী পতিত জমি ৩ হাজার ৮৭৩ হেক্টর এবং বনভূমি ১৫০ হেক্টর। মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৯ হেক্টর। আবাদি জমির মধ্যে ৮ হাজার ২৯৬ হেক্টর উঁচু জমি, ৮ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমি মাঝারি

উঁচু এবং ২ হাজার ৩৯৫ হেক্টর নিচু জমি রয়েছে। এসব জমির মধ্যে স্থায়ী পতিত ও উঁচু জমিতে চা চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী পঞ্চগড় জেলায় বর্তমানে ৪ হাজার ৭০০ একর জমিতে চা চাষ হয়েছে। এর অধিকাংশ জমিই তেঁতুলিয়া উপজেলার।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পঞ্চগড় জেলা প্রায় ৩০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ছোট-বড় প্রায় ২৫ নদনদী। প্রতি বছর বন্যায় বিপুল পরিমাণ ছোট ও মাঝারি আকৃতির নুড়ি পাথর বয়ে নিয়ে আসে এ নদীগুলো। যা সারফেস ডিপোজিট হিসেবে জমা হয়ে নদীর তলদেশ ও আশপাশের মাটির নিচে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার শ্রমিকরা নদী থেকে পাথর সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। পাথরের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন দেদারসে সমতল ভূমি খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাথর উত্তোলনের কোনো নীতিমালা না থাকায় এক শ্রেণির পাথর ব্যবসায়ী শুধু পাথর তোলার জন্য জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সমতলের আবাদি ভূমি হতে প্রায় ৩০-৪০ ফুট গর্ত করে পাথর উত্তোলন করছে। এতে জমির মাঝখানে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল গর্তের। পাথর উত্তোলন শেষে তারা ওই জমি মালিককে ফেরত দিচ্ছে। আবার অনেক মলিক নিজেও শ্রমিক দিয়ে পাথর উত্তোলন করছেন। সাময়িক লাভের আশায় কৃষকরা তাদের ফসলি জমি থেকে পাথর উত্তোলন করতে দিলেও অনেক টাকা খরচ হওয়ায় তারা অধিকাংশ জমির গর্ত ভরাট না করে ফেলে রেখেছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ উপজেলার অধিকাংশ জমি বালিয়াড়ি হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

পঞ্চগড় জেলায় ৯ নিবন্ধিত এস্টেট বা বড় বাগান, ১১ স্মল হোল্ডার্স ও ৩৮০ স্মল গ্রোয়ার্সের চা বাগান রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছোট চা বাগান। বড় চা বাগান মালিকরা একসঙ্গে উঁচু-নিচু জমি মিলেয়ে কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনে নিয়েছে। উঁচু জমিতে চা লাগিয়ে নিচু জমি ফেলে রেখেছে বা অন্য আবাদ করছে। এছাড়াও বহুজাতিক অনেক কোম্পানি শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য জমি কিনে শুধু সাইনবোর্ড দিয়ে রেখেছে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন চালু হওয়ার পরও অনেকে এখনো কারখানা গড়ে তোলার কাজ শুরুই করেনি।

পঞ্চগড়ের শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন ভজনপুর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম বলেন, তেঁতুলিয়া অঞ্চল প্রাণ প্রকৃতির আবাসস্থল । এখানকার সবুজ গাছপালা এবং নদনদীর ওপর পরিবেশ বিধ্বংসীদের কুনজর পড়েছে। এ প্রাণ প্রকৃতি সুরক্ষিত রাখতে জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার।

পাথরাজ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ভুগোল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পরিবেশবিদ আলতাফ হোসেন জানান, পঞ্চগড় জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন। সমতলের আবাদি জমি ধ্বংস করে, সেই জমি থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। সমতল ভূমি থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হলেও কেউ তা মানছে না। আবার ড্রেজার মেশিন দিয়েও মাটির অনেক গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। শিল্প কারখানা ও চা বাগানের জন্য আবাদি জমি ক্রয় করা যাবে না, এমন নিয়ম থাকলেও কেউ এ নিয়ম মানছে না। এতে করে কৃষিজমি হারিয়ে অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি কৃষক শ্রমিকে পরিণত হবে। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবও পড়বে এ এলাকায়।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, জেলার সব প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করতে আমরা সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। সমতল ভূমি কেটে অথবা অন্য কোনো উপায়ে আবাদি জমি যেন অনাবাদি না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের কড়া নজরদারি রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন