উপকারভোগীদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কের দুপাশে লাগানো প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ নিলামে বিক্রি করেছে বন বিভাগ। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এসব গাছ কাটার কাজ শুরু হয়েছে। এদিকে গাছ কাটার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে হাওড় ও নদীরক্ষা আন্দোলন এবং ফুঁসে উঠছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা গেছে, প্রায় ২৬ বছর আগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় উপকারভোগীদের সহায়তায় সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কের দুপাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছিল বন বিভাগ। দীর্ঘদিনের পরিচর্যায় গাছগুলো বড় হয়ে সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রেখে আসছিল। সম্প্রতি সামাজিক বনায়নের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বন বিভাগ এসব গাছ নিলামে বিক্রি করে। নিলাম থেকে পাওয়া অর্থের নির্ধারিত অংশ স্থানীয় উপকারভোগীদের দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে গাছ কাটা শুরু হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে।
সরেজমিন দেখা যায়, সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কের দুপাশে সারি সারি গাছ। এর মধ্যে নিয়ামতপুর থেকে ইচ্ছেরচর পর্যন্ত এলাকায় গত এক সপ্তাহে শিলকড়ই, বেলজিয়াম, রেইনন্ট্রি ও আকাশিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। গাছ কাটার পর সেগুলো সড়ক থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ঠিকাদারের শ্রমিকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে বেড়ে ওঠা এসব গাছ একসঙ্গে কেটে ফেলায় সড়কের নান্দনিকতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাদের দাবি, গাছ কাটার পাশাপাশি নতুন করে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বন বিভাগ জানায়, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় করা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নির্ধারিত নিয়মে গাছগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থের অংশ উপকারভোগীদের দেওয়া হবে।
স্থানীয় উপকারভোগী মানিক মিয়া বলেন, আমরা দীর্ঘদিন এসব গাছের যত্ন নিয়েছি। গাছগুলো বড় করতে আমাদের অনেক শ্রম ও সময় গেছে। এখন গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। উপকারভোগীদের পাওনা দেওয়ার বিষয়টি ঠিক আছে, কিন্তু গাছ কাটার আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ২৬ বছর ধরে গাছগুলো সড়কের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। এখন একসঙ্গে এত গাছ কেটে ফেললে পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়বে। পুরোনো গাছ কাটার পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক সদস্য জসীমউদ্দিন বলেন, ‘সামাজিক বনায়নের গাছ স্থানীয় মানুষের শ্রম ও পরিচর্যায় বড় হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গাছ বিক্রি করা হলেও পরিবেশগত বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এত বড় পরিসরে গাছ কাটার আগে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী হবে, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।’
পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, ‘গাছ শুধু কাঠ হিসেবে দেখলে হবে না। এসব গাছ দীর্ঘদিন সড়কের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষা করে আসছে। প্রখর রোদে ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়। পর্যটকরা ঘুরতে আসেন। হাজার হাজার গাছ কেটে ফেললে প্রাকৃতিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়বে। গাছ কাটার পাশাপাশি সমপরিমাণ বা তার বেশি নতুন গাছ লাগানোর কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।’
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি তারেক মিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কথা বলেছেন সেখানে গাছ কাটা খুবই দুঃখজনক। দ্রুত গাছ কাটা বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বন বিভাগের জেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বন বিভাগ ও স্থানীয় উপকারভোগীদের যৌথ মালিকানায় ২০০১ সালে সাচনা-সুনামগঞ্জ সড়কে গাছ লাগানো হয়েছিল। অনেক গাছ মরে গেছে। আরো তিন বছর পর গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। তখন বন বিভাগের প্রতি উপকারভোগীরা আস্থা হারাবে। তাই গাছগুলো নিলাম করে বিক্রি করা হয়েছে। নিলামের অর্থ থেকে চুক্তি অনুযায়ী উপকারভোগীদের প্রাপ্য অংশ দেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

