সংবাদ প্রকাশের জেরে এক বছর পর চার সম্পাদক ও এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম হাসিবের বিরুদ্ধে। গত ১১ জুলাই মতিহার থানায় করা ওই মামলায় রাবি প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহসভাপতি এবং দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশনসহ চার গণমাধ্যমের সম্পাদককে বিবাদী করা হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে মামলাটি এখনো নথিভুক্ত করা হয়নি, তদন্ত চলছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট দপ্তরে জব্দ থাকা এক ব্যবসায়ীর ফুডকার্ট মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই স্টোর শাখা থেকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে হাসিবুল ইসলাম হাসিবের বিরুদ্ধে। ফুডকার্টটি ফিরে পেতে প্রকৃত মালিক আক্তার সাংবাদিকদের সহায়তা চান। এ নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা ফুডকার্টটি ওই ব্যবসায়ীর কাছে ফেরত দেন।
এর প্রায় ৯ মাস পর, ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড এলাকায় বহিরাগতদের নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠে হাসিবের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসসহ ২০ থেকে ২৫টি পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
ওই দুই সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ১১ জুলাই মতিহার থানায় মামলা করেন হাসিবুল ইসলাম হাসিব। মামলায় তিনি দাবি করেন, তাকে হেয়প্রতিপন্ন এবং রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলায় আসামি করা হয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, সকালের বুলেটিনের সম্পাদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সম্পাদক এবং এনটিভি অনলাইনের সম্পাদককে। এছাড়া ছুরিকাঘাতের ঘটনায় অভিযোগকারী শিক্ষার্থী হাসানকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
ফুডকার্টসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে মামলার এজাহারে হাসিব দাবি করেছেন, তিনি ফুডকার্টের মালিককে সেটি ফিরে পেতে সহায়তা করেছিলেন। তবে ফুডকার্টটি ফেরত নেওয়ার জন্য হাসিবের নিজের হাতে লেখা একটি আবেদনপত্রের কপি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা তার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ছুরিকাঘাতের ঘটনা অস্বীকার করে হাসিব বলেন, ওই সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তবে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ঘটনার সময় ছাত্রদল নেতা হাসিব সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তার উপস্থিতিতেই হামলা হয়।
মামলার বাদী সাংবাদিক মারুফ হোসেন মিশন বলেন, যে দুটি সংবাদ প্রকাশের কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, সেগুলো ২০ থেকে ২৫ জন সাংবাদিক কভার করেছিলেন। অথচ শুধু তার বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়েছে, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক।
তিনি বলেন, ওই দুটি নিউজের শতভাগ প্রমাণ আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। ছাত্রদল নেতা হাসিব ফুডকার্টটির মালিকানা দাবি করে নিজের হাতে আবেদন করেছিলেন। সেটির কপিও আমার কাছে আছে। এছাড়া ভুক্তভোগী ও এস্টেট দপ্তরের বক্তব্যও সংরক্ষিত রয়েছে। আমি আইনকে শ্রদ্ধা করি এবং আইন অনুযায়ী লড়তে প্রস্তুত আছি। মামলার ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখা যায় না।
শুধু তার বিরুদ্ধেই মামলা করার কারণ জানতে চাইলে মারুফ হোসেন মিশন বলেন, যারা হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছে, তাদের নিয়ে আমি কয়েকটি সংবাদ করেছি। এর মধ্যে তিনটি নিউজের অভিযুক্তরা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এজন্য ছাত্রদলের ওই নেতা আমাকে ভয়ভীতি দেখানোর উদ্দেশ্যেই মামলা করেছেন, যাতে অবৈধভাবে হলে অবস্থানকারীদের নিয়ে আর সংবাদ না করি। সংবাদ করেছেন ২৫ জনের বেশি সাংবাদিক, অথচ মামলা করা হয়েছে শুধু আমার বিরুদ্ধে। আমি এর নিন্দা জানাই।
একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও শুধু একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে হাসিব বলেন, সে সাংবাদিক পরে, আগে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমরা ভাই-ভাই। তবে ছাত্রদলের কোনো বিষয় নিয়ে কোনো কথা গেলেই সে যাচাই-বাছাই না করে মনগড়া ও ইচ্ছাকৃতভাবে নানা ধরনের কথা তুলে ধরে। যেকোনো অপপ্রচার, মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা সে শুরু করে। পরে তার সংবাদ থেকে অন্যরা কপি করে।
ফুডকার্টের বিষয়ে হাসিব বলেন, যার ফুডকার্ট, তাকে সেটি ফিরে পেতে আমিই সাহায্য করেছি। তার হয়ে আমি আবেদন করেছিলাম, তবে সে বিষয়টি জানত না। সেজন্য একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছি।
ছুরিকাঘাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে ছেলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, সে আগে ছাত্রলীগ করত। এখন নতুন করে ছাত্রদলের রাজনীতিতে এসেছে। সে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। তাকে দিয়ে অন্য কেউ এই কাজ করিয়েছে।
দেরিতে মামলা করার বিষয়ে হাসিব বলেন, আমি ধৈর্য ধরেছি। চেষ্টা করেছি এগুলো থামানোর জন্য। কিন্তু তিনি একটার পর একটা অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত পরিবার ও সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।
এ বিষয়ে মতিহার থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বলেন, কেউ মামলা করতে চাইলে প্রথমে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হয়। ঘটনা সত্য কি না, তা অনুসন্ধান করা হয়। মামলার এজাহারে বাদী যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর তেমন কোনো প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। এজন্য মামলাটি এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তবে অনুসন্ধান চলছে।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, মামলা করার বিষয়টি সে (হাসিব) আগে আমাকে জানিয়েছিল। প্রথমে আমরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেইনি। পরে সে এসে জানায়, তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হেয়প্রতিপন্ন বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। তখন আমি তাকে বলি, সংগঠন হিসেবে তো বিচার এনে দিতে পারব না। তুমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলো। পরে সে জানায়, সে জিডি করতে চায়। আমি বলেছি, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। সংগঠন থেকে তাকে কোনো কিছু করতে বলা হয়নি।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

