সিডিএফ বন্ধ, চিকিৎসাবঞ্চিত ৩৬ বাগানের চা-শ্রমিক

এম এ হামিদ, মৌলভীবাজার

সিডিএফ বন্ধ, চিকিৎসাবঞ্চিত ৩৬ বাগানের চা-শ্রমিক

ষষ্ঠ শ্রেণির স্কুল ছাত্রী ঐশি রবিদাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের শমশেরনগরের ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালে টানা ১৫ দিন থেকে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে করে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৬ বাগানের লক্ষাধিক চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অধিক টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাসপাতাল বন্ধ থাকায় গত কয়েকদিনে বিভিন্ন বাগানে বেশ কয়েকজন শ্রমিক বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ারও দাবি শ্রমিক নেতাদের।

সরেজমিনে হাসপাতাল ও এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ক্যামেলিয়া হাসপাতালের ওয়ার্ড গার্ল নিলু র‌্যালি। তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এ হাসপাতালে কর্মরত আছেন। তিনি জানান, একদিনের জন্যও হাসপাতাল বন্ধ না হলেও হঠাৎ করে গত ২৭ মার্চ থেকে হাসপাতাল বন্ধ হয়ে আছে। তিনি আরো বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতেন। এখন সেখানে প্রাণহীন হয়ে বেডগুলো পড়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতাল ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন ৩৬ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানে অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায়, শুধু হাসপাতাল কর্মী না, বাগানের চা শ্রমিকরাও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পড়েছেন সমস্যায়। ক্যামেলিয়া হাসপাতালে এক টাকাও খরচ না হলেও সরকারি হাসপাতালে গিয়ে সবকিছু ক্রয় করে এনে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

লংলা চা বাগানের বাবুল পাশি বলেন, স্ত্রী অসুস্থ থাকায়, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। সর্বসাকুল্যে খরচ হয়েছে সাত থেকে আট হাজার টাকা। কিন্তু ক্যামেলিয়া হাসপাতাল খোলা থাকলে এ খরচ হতো না।

কমলগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রামপতি রবিদাস ও তার স্বামী জানান, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল বন্ধ থাকায় তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ওষুধ, যে কোনো টেস্ট বাহিরে থেকে টাকা দিয়ে করে আনতে হচ্ছে। এছাড়াও শিশু বাচ্ছা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা জয়রাম ভৌমিক ও সুমন বৈদ্যও একই অভিযোগ করে বলেন, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালু থাকলে তাদের একটি টাকাও খরচ হতো না। সম্পূর্ণ ফ্রিতে তারা চিকিৎসা নিতে পারতেন।

চা শ্রমিক নেতা ও শমসেরনগর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সিতারাম বিন বলেন, ঐশির ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকদিন থেকে হাসপাতাল বন্ধ থাকায় চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ চা শ্রমিকরা। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাকে অনেকটা বিনা চিকিৎসায় তিনজন শ্রমিক মারা গিয়েছে। তারা হলেনÑমাধুরী সাহা (৪০), রুমি ভর (২৩) ও লক্ষ্মী মুনি তেলী (৮০) ।

তিনি বলেন, ইংল্যান্ড থেকে একটি প্রতিনিধিদল এসে তাদের সঙ্গে আলাপ করলেও এখনো হাসপাতাল খুলে দেওয়া হয়নি। এ নেতাসহ শ্রমিক নেতাদের দাবি হাসপাতাল অচিরে খুলে দিয়ে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম ভুঁইয়া জানান, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল বন্ধ থাকায় তাদের রোগীর চাপ বেড়েছে।

২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, মৌলভীবাজারের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানান, সাধারণত ক্যামেলিয়া থেকে রেফার্ড হয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে আসতেন। তবে বর্তমানে হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সরাসরি অনেক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। এতে করে তাদের চাপ বেড়েছে।

ডানকান ব্রাদার্সের প্রধান কার্যালয়ের সমন্বয়কারী হুমায়ুন কবির জানান, ইংল্যান্ড থেকে একটি টিম এ বিষয়ে দেশে এসে কাজ করছে। তারাই বলতে পারবেন হাসপাতাল কবে খুলবে।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতাল খোলার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৬ মার্চ রাতে শমশেরনগর চা বাগানের বাসিন্দা রবিদাসের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ঐশী রবিদাস হাসপাতালে ভর্তির পরের দিন মারা গেলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা হাসপাতালে গিয়ে স্টাফদের অবরুদ্ধ করে ভাঙচুর চালায়। সেদিন থেকে বন্ধ রয়েছে হাসপাতাল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...