আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হাওরের বুক ভাসিয়ে কৃষকের কান্না

এম ইদ্রিস আলী, মৌলভীবাজার

হাওরের বুক ভাসিয়ে কৃষকের কান্না
মৌলভীবাজারের বিশাল কাউয়াদিঘি হাওর আজ যেন আর ফসলের খনি নয়, হতাশার অশ্রুভেজা এক মাঠ।

হাওরের বুক যেন কৃষকের চোখের জলের মতো, কোথাও ডুবে আছে বীজতলা, কোথাও আবার রোপণ করা ধান গিলে ফেলেছে অচল পানির স্রোত। মৌলভীবাজারের বিশাল কাউয়াদিঘি হাওর আজ যেন আর ফসলের খনি নয়, হতাশার অশ্রুভেজা এক মাঠ।

বিজ্ঞাপন

বুধবার দুপুরে বড়কাপন, জগতপুর, রায়পুর, আখাইলকুড়া, কাশিমপুর ঘুরে দেখা গেছে ‘অপরিসীম কষ্টের ছবি’। কাদা জলে ভেসে আছে কৃষকের ঘাম-ঝরানো শ্রম। রোপা আমনের মৌসুম প্রায় শেষ, অথচ হাজারো কৃষক এখনো জমিতে চারা রোপণ করতে পারেননি।

জগতপুর গ্রামের কৃষক মোত্তালিব মিয়া ভাঙা গলায় বললেন, প্রত্যেক বছর এই জলাবদ্ধতা আমরার সবকিছু কাড়িয়া লইয়া যায়। ঋণ করি চাষ করি, শেষে এই পানিতেই ভাসি। পানি নামতেছে না, আমরা তো শেষ। কিতার লাগি যে পানি নামার না, আল্লায় জানে।

আখাইলকুড়ার মোকাম উদ্দিনের কণ্ঠেও একই বেদনা, তোরা কিছু আবাদ করছিলাম, তাও ভুরিয়া নষ্ট হইয়া গেল। গত বছরও ক্ষতি হইছিল। সরকার তাকি কিসু পাই না। ভুর্তকি পাই না, সহায় পাই না। কৃষকরা খুব মরাত।

ভাদ্র মাসের মধ্যে যদি পানি না যায়, যে হালিগুলা গজাইছি সব শেষ অই যাইবো
ভাদ্র মাসের মধ্যে যদি পানি না যায়, যে হালিগুলা গজাইছি সব শেষ অই যাইবো

রায়পুরের শহীদ আরও যোগ করলেন, ভাদ্র মাসের মধ্যে যদি পানি না যায়, যে হালিগুলা গজাইছি সব শেষ অই যাইবো। সরকার যদি ব্যবস্থা না নেয়, আমাগো বাঁচাইবো কে?

বড়কাপনের বাবুল আহমেদের কথা যেন চূড়ান্ত আর্তনাদ, আমরার ধান এখন পানির নিচে। পাম্পে যাই কিন্তু পানি নামতেছে না। আমাগো অবস্থা খুবই কষ্টের।

কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের কৃষকেরা শুধু ধান রোপণ করছেন না, তারা প্রতিদিন জীবন বাঁচানোর লড়াই করে যাচ্ছেন। ১৯ হাজার ২৭৮ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি বাঁচাতে প্রয়োজন কাশিমপুর পাম্প হাউজের সব মেশিন সচল রাখা।

কাশিমপুর পাম্প হাউজ
কাশিমপুর পাম্প হাউজ

রেজাউল করিম খসরু ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, আটটা মেশিন যদি ঠিক মতো চালানো হইত, তাহলে হাওরের এত জমি পানির নিচে থাকত না। কৃষকের এতো ক্ষতি হইত না।

হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদর উপজেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ধানের মৌসুমে বীজতলা বানাইছি কিন্তু রোপণ করতে পারতেছি না। কর্তৃপক্ষের বারবার আবেদন করছি কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয় নাই। খাল-ছড়া খনন করলে এই জলাবদ্ধতা এতো ভয়াবহ হতো না।

এই মৌসুমে মৌলভীবাজারে ৯৮ হাজার হেক্টরে আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা হলেও কাউয়াদিঘির বুক ভেসে যাওয়ায় শঙ্কা কাটছে না। কৃষকের চোখে জল, জমিতে জল—দুটোই মিশে গেছে।

কৃষকের বুকফাটা কান্না যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। ধান রোপণের মৌসুম শেষ হয়ে এলে কী হবে তাদের? সংসারের ভাত কই থেকে আসবে?

হাওর আজ শুধু জলাবদ্ধতায় আটকে নেই আটকে আছে কৃষকের স্বপ্ন
হাওর আজ শুধু জলাবদ্ধতায় আটকে নেই আটকে আছে কৃষকের স্বপ্ন

মৌলভীবাজারের হাওর আজ শুধু জলাবদ্ধতায় আটকে নেই আটকে আছে কৃষকের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর ভবিষ্যৎ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কাশিমপুর পাম্পগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু আছে। আশা করছি, ৯ হাজার হেক্টরে আবাদ হবে। এবছরের বৃষ্টিপাত আমনের জন্য ভালো।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কাহিনি বলছে। কৃষকের চোখে আশার আলো কম, হতাশার মেঘই বেশি ঘন হয়ে আছে।

কৃষকের চোখে আশার আলো কম, হতাশার মেঘই বেশি ঘন হয়ে আছে
কৃষকের চোখে আশার আলো কম, হতাশার মেঘই বেশি ঘন হয়ে আছে

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানালেন, পাম্প হাউজ মূলত বোরো মৌসুমের জন্য নির্মিত। বর্ষাকালে এত পানির চাপ সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই। হাওরের নিচু জমিতে আমন রোপণ করলে তা ডুবে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী।

তিনি আরও বলেন, নতুন পাম্প হাউজ দরকার, আর হাওরের পানির লেভেল ৭.৫০ এ নামিয়ে রাখলে পরিবেশ ও মৎস্যজীবনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এজন্য সমীক্ষা জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন