আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিছনাকান্দিতে জিম্মায় থাকা পাথর লুট

ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টা, তদন্তে নেই অগ্রগতি

খালেদ আহমদ, সিলেট

ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টা, তদন্তে নেই অগ্রগতি

সিলেটের সাদা পাথরের মতো লুটপাট হয়েছিল জেলার আরেক পর্যটন কেন্দ্র বিছনাকান্দির পাথরও। এসব পাথর উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে একটি টাস্কফোর্স। গত বছরের ৩ নভেম্বরের অভিযানে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৮০৯ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা।

পাথরগুলো বিছনাকান্দি ইউপি সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা পাভলু মিয়া এবং রুস্তুমপুর ইউপি সদস্য বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিনের জিম্মায় রাখা হয়। তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা পাথর হাওয়া হয়ে যায় রাতের আঁধারে। এরপর ১১ মাস পার হলেও একটি পাথরও উদ্ধার করা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, সরকারি এসব পাথর নিলামের জন্য গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর দরপত্র আহ্বান করে খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি)। নিলাম মূল্য ধরা হয়েছিল এক কোটি ৮৭ লাখ টাকা (প্রতি ফুট পাথরের মূল্য ৭৫ টাকা হারে)। কিন্তু নিলামে অংশগ্রহণকারীরা পাথর পরিদর্শনে গেলে বিএমডি তাদের কোনো পাথর দেখাতে পারেনি। ফলে বাতিল হয়ে যায় নিলাম কার্যক্রম।

আরো জানা গেছে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে গোয়াইনঘাটের বিছানাকান্দিতে শুরু হয় পাথর লুট। পাথরখেকোরা পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে দিনরাত পাথর উত্তোলন করে বিভিন্ন এলাকার বাড়ির আঙিনা ও সড়কের পাশে মজুত করে রাখে। এ কারণে পর্যটন কেন্দ্রটি বিরানভূমিতে পরিণত হয়।

জিম্মাদারদের তত্ত্বাবধানেই পাথর পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় মামলা করেছিলেন এক জিম্মাদার বর্তমান ইউপি সদস্য বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন। তিনি জানান, নিরাপত্তাকর্মী দিয়েও তিনি পাথর রক্ষা করতে পারেননি। লুটের বিষয়টি তিনি তৎকালীন ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি ও তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন লুটপাট বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাদের নীরবতা ও গাফিলতির কারণে লুট ঠেকানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি লুটের ঘটনায় থানায় মামলা করেন বলে জানান।

তিনি বলেন, পাথরগুলো আমি আটকাতে গেলে মারধরের শিকার হতাম। গত শনিবার বিকালে এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্বীকার করেন, প্রভাবশালীরাই পাথর লুট করে নিয়ে গেছে। পুলিশের সহযোগিতায় তিনটি চেকপোস্ট বঙ্গবীর, সালুটিকর এবং গোয়াইনঘাটের জাফলং হয়ে পাথরগুলো পাচার হয়েছে। এর সঙ্গে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর লুটপাট হয়েছে বেশি।

তিনি এর সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে বলেন, ব্যর্থ হয়ে আমি সারেন্ডার করি। লুটপাট বন্ধ করতে পারিনি। পরে আমি বাধ্য হয়ে মামলা করি। মামলার বর্তমান অবস্থা কীÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা কী করেছেন তা জানি না। নতুন ওসি এসেছেন। এখনো দেখা হয়নি। দুই-চারদিনের মধ্যে গিয়ে দেখা করব। তখন জানতে পারব।

তার সহযোগী আরেক জিম্মাদার পাভলুকে বারবার ফোন দেওয়ার পরও কেন রিসিভ করেছন নাÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, তার ফোন সব সময় বন্ধ থাকে। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক মেম্বার। বর্তমানে তিনি আত্মাগোপনে আছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলার জাঙ্গাইল গ্রামের সামছুদ্দিন আল আজাদ মেম্বার সিলেটের জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন সিলেটের উপপরিচালক এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি আত্মসাৎ করা সরকারি পাথর উদ্ধার এবং আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ইউপি সদস্য বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন ও আওয়ামী লীগ নেতা পাভলু মিয়া (পাবেল)-সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।

তিনি দাবি করেন, দুই জিম্মাদার মেম্বার ট্রাকে পাথর বোঝাই করে উপরে বালু দিয়ে এগুলো ধোপাগুল ক্রাশার মেশিনে পাচার করেছেন।

দুই ইউপি সদস্যের জিম্মায় থাকাবস্থায় পাথর প্রকাশ্যে লুট হয়ে যায়। সে সময় বিষয়টি ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি ও বিট পুলিশ কর্মকর্তাকে অবগত করা হলেও কেউই চুরি ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করেন গোয়াইনঘাটের জাঙ্গাইল গ্রামের ইউপি সদস্য সামছুদ্দিন আল আজাদ। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের যোগসাজশেই লুটের পাথর ফের লুট করা হয়। পাথর লুট শেষ হওয়ার পর জিম্মাদার দুই ইউপি সদস্যকে দিয়ে মামলা করানোর উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় মামলা করেন রুস্তুমপুর ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান বিছনাকান্দি বিট পুলিশিং কর্মকর্তা এসআই রাকিব হোসেন। কিন্তু গত ১১ মাসেও তিনি তদন্তের কোনো অগ্রগতি করতে পারেননি। এমনকি পাথর উদ্ধার কিংবা কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেননি তিনি।

এ ব্যাপারে এসআই রাকিব হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মামলার অগ্রগতির ব্যাপারে কিছু জানি না। আমি সেখান থেকে ওসমানীনগর থানায় বদলি হয়ে এসেছি।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে থানায় মামলা হলেও পরে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আমার জানা নেই।

লুটের পাথর উদ্ধার ও মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে গোয়াইনঘাট থানার ওসি সদ্য বদলি হওয়া সরকার তোফায়েল আহমদ কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, মামলাটির তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা তার মনে পড়ছে না। খোঁজ নিয়ে তিনি পরে জানানোর কথা বললেও আর জানাননি।

বর্তমানে নবনিযুক্ত গোয়াইনঘাট থানার ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার আমার দেশকে জানান, আমি কয়েকদিন হলো যোগ দিয়েছি। ১৮২টি মামলার মধ্যে এ মামলার বিষয়ে আমি এখনো অবগত হতে পারিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন