আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সিলেটে নির্বাচনি প্রচারে নেই সংঘাত, প্রশংসিত হচ্ছে প্রার্থীদের সহনশীলতা

খালেদ আহমদ, সিলেট

সিলেটে নির্বাচনি প্রচারে নেই সংঘাত, প্রশংসিত হচ্ছে প্রার্থীদের সহনশীলতা

পোস্টার, মিছিল আর ভুরিভোজের চেনা নির্বাচনি দৃশ্য এবার অনুপস্থিত হলেও সিলেটে ভোটের উত্তাপ কমেনি। বরং সংঘাতবিহীন পরিবেশ, প্রার্থীদের সহনশীল আচরণ আর ভোট দিতে গ্রামে ফেরার প্রবণতায় সিলেটের নির্বাচনি প্রচার ইতোমধ্যে ‘মডেল প্রচার’ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

সিলেটে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিন-রাত প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। পাড়া-মহল্লা থেকে গ্রাম পর্যন্ত পথসভা, গণসংযোগ এবং স্লোগানে মুখর থাকলেও আগের মতো পোস্টারিং ও আপ্যায়নের চেনা দৃশ্য এবার চোখে পড়ছে না। নতুন আচরণবিধির কারণে এই পরিবর্তন হলেও ভোটারদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি।

বিজ্ঞাপন

ছয়টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত সিলেট জেলায় আনুষ্ঠানিক প্রচারের দুই-তৃতীয়াংশ সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সংঘাত বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। জেলার ছয় আসনে বিভিন্ন দলের মোট ৩৩ প্রার্থী নির্বিঘ্নে ও আনন্দমুখর পরিবেশে প্রচার চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি আমার দেশকে বলেন, গত ১৫ দিনে কোনো অঘটন ঘটেনি। কোনো প্রার্থী প্রচার কর্মকাণ্ডে বাধার মুখে পড়েছেন—এমন লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি। প্রার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সৌহার্দ বজায় রয়েছে। বলতে গেলে সিলেটে ‘মডেল প্রচার’ চলছে। প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ পিপিএম জানান, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। ছোটখাটো দু-একটি স্থানীয় ঘটনা ছাড়া কোনো বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। সব টিম প্রস্তুত রয়েছে, কেন্দ্রগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরীও সিলেটের ভোটের পরিবেশ নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। এবার বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে যাবেন বলে তার বিশ্বাস।

সিলেট জেলার ছয় আসনে ভোটারসংখ্যা ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৬৫২। এর মধ্যে সিলেট-১ আসনে ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬, সিলেট-২-এ তিন লাখ ৬৮ হাজার ৯৩২, সিলেট-৩-এ চার লাখ ১৬ হাজার, সিলেট-৪-এ পাঁচ লাখ ১২ হাজার ৯৩৩, সিলেট-৫-এ চার লাখ ২৮ হাজার ৭৪৮ এবং সিলেট-৬-এ ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩ ভোটার রয়েছেন।

ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ স্পষ্ট হলেও অনেকেই বলছেন, পোস্টারবিহীন ও আপ্যায়নবিহীন প্রচারে আগের উৎসবের আমেজ নেই। শহরতলির ইসলামপুরের হারিছ আলী বলেন, ‘এ কেমন ভোট! পোস্টার নাই, খাওয়া-দাওয়া নাই!’

বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরাও বলেন, ভোট মানে খাওয়া-দাওয়া হবে, পোস্টারে ছেয়ে যাবে। নেতার বাসায় খানাপিনা হবে, উৎসব হবে, পোস্টার নিয়ে বের হয়ে কাজ শেষ করে আবার এসে খাব। জমজমাট আড্ডায় হাতি-ঘোড়া মারা হবেÑএ রকম না হলে নির্বাচন কীসের? মুখ শুকিয়ে নির্বাচনি প্রচার হয় নাকি?

সিলেটের ছয়টি আসনে বিএনপি-জামায়াতসহ ৩৩ জন প্রাথী। জামায়াত জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে শরিকদের কাছে তিনটি ছেড়ে দিয়েছে। বিএনপি ছেড়েছে একটি। এর ফলে সিলেটে ৪-২-এ খেলা হতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শহর ও গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটারই এবার ভোট দিতে আগ্রহী। অনেক শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ ভোটের দিন নিজ নিজ গ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শাবির ছাত্র নবীগঞ্জের মঈনউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, এবারই প্রথম ভোট দেব, মিস করি কীভাবে। ভালো একটা অনুভূতি হচ্ছে। দিরাই উপজেলার জাবেদ চৌধুরী স্ত্রী, মা, ভাই, ভাবিসহ পুরো পরিবার নিয়ে যাবেন কুলঞ্জ গ্রামে। তাদের পরিবারের লোক এমপি ইলেকশন করছেন। তাই ভোটও দেবেন, বেড়িয়েও আসবেন। নেত্রকোনার মদনের আটগ্রামে ভোট দিতে যাবেন ৭০-ঊর্ধ্ব সুন্দরী বিবি। তিনি বলেন, না গেলে তো ভোটটা নষ্ট হবে।

স্থানীয় রাজনীতিক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। কিছু আসনে জোট প্রার্থী ও বিদ্রোহীদের উপস্থিতিতে লড়াই আরো জমে উঠতে পারে।

জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে বিএনপি নিজের কাছে রেখেছে ৫টি। শরিকদের জন্য ছেড়েছে একটি। অন্যদিকে জামায়াত নিজেদের হাতে অর্ধেক আসন রেখে বাকি তিনটি দিয়েছে শরিকদের। প্রধান দুই জোটের প্রার্থীদের মধ্যে সিলেট-১-এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান। সিলেট-২ আসনে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা; অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুনতাছির আলী। সিলেট-৩ আসনে বিএনপির এমএ মালিক এবং ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীন রাজু। সিলেট-৪-এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর জয়নাল আবেদীন। সিলেট-৫ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক আর ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদও (চাকসু মামুন) শক্ত প্রার্থী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। আর সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হচ্ছেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

সব মিলিয়ে সংঘাতহীন প্রচার, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি আর ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সিলেটের নির্বাচনকে একটি ‘মডেল নির্বাচন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে স্থানীয় ভোটাররা মনে করছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...