দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের পুরোনো স্থাপনাগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব ভবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খসে পড়ছে এসব ভবনের ভারী ইটের গাঁথুনি, দরজা-জানালা, লোহা ও ইস্পাতের অ্যাঙ্গেল। ফেটে চৌচির হয়ে গেছে পাকা প্ল্যাটফর্ম। যেকোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ এই পুরানো রেলওয়ে জংশনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছেনা ।
রেল সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলের ১৮৯৬ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে কুলাউড়া হয়ে আখাউড়া-বদরপুর সেকশন চালু হয়। ১৯১২ সালের ১৬ এপ্রিল কুলাউড়া থেকে কুশিয়ারী ঘাট পর্যন্ত ব্রাঞ্চলাইন চালুর মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ জংশনের মর্যাদা পায়। পরবর্তীতে ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে কুলাউড়া-সিলেট লাইন চালু হয়। কুলাউড়া স্টেশনের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো- ঐতিহাসিক ‘লাতুর ট্রেন’, যা কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করত। একসময় এই জংশনের মাধ্যমে ভারতের মহীশাসন, করিমগঞ্জ ও আসামের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল। তখন চা, পাট, কৃষিজাতপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য মালবাহী ট্রেনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ হতো। চলাচল করতেন শত শত যাত্রী। বড় সাহেব নামে পরিচিত ব্রিটিশ আমলের চা বাগানের ব্রিটিশ মালিক, ম্যানেজারসহ উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা লাতু ট্রেনে করে কুলাউড়া জংশন স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করতেন। সেই আমলে জংশন স্টেশনে ছিল বাগান মালিক ও ম্যানেজারের স্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর লাল ইটের তৈরি ও নান্দনিক আসবাবপত্র এবং ব্রিটিশ আদলের ক্রোকারিজে ভরপুর ছিল রিফ্রেশমেন্ট রুম ও পানশালা। এছাড়াও ছিল হিন্দু ও মুসলিম হোটেল। পানশালা, রিফ্রেশমেন্ট রুম, হিন্দু ও মুসলিম হোটেল যাত্রীদের পদভারে মুখর ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫ সালে কুলাউড়া জংশন স্টেশনের সঙ্গে শাহবাজপুর স্টেশনের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর থেকেই ঐতিহাসিক সব স্থাপনা ধ্বংসের প্রান্তে এসে পৌঁছে যায়।
এ ব্যাপারে জংশন স্টেশনের পার্শ্ববর্তী এলাকা জয়পাশার বাসিন্দা কুলাউড়া শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সম্পাদক প্রভাষক সিপার উদ্দিন আহমদ বলেন, কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন বৃহত্তর সিলেটের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। রেলের ইতিহাসের গুরুত্ব বহন করে এই জংশন। অবহেলা-অনাদরে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাচীন ঐতিহাসিক এসব নিদর্শনগুলো।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার রুমান আহমদ আমার দেশকে বলেন, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনের স্থাপনাকে সংরক্ষণের উদ্যোগ এখনো হাতে নেওয়া হয়নি। প্রাচীন স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের চাপের মুখে তা ভেঙে ফেলা হয়নি।
সিলেট সেকশনের সহকারী প্রকৌলশী মাসুদ পারভেজ আমার দেশকে জানান, কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের স্থাপনাগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। এটি রক্ষা করতে হেরিটেজ রক্ষা বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল এগিয়ে আসলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ উদ্যোগ নেবে বলে আশা করা যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

