বাবা, মা ও একমাত্র বড় ভাই শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় কোনোমতে চলছিল সংসার। সেই পরিবারে একমাত্র আশার আলো ছিলেন আলিফ। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজের খরচ চালাতেন। একই সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
কিন্তু হবিগঞ্জ শহরে এনসিপি নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলায় দৃষ্টিশক্তিই হারানোর শঙ্কায় এখন আলিফি চৌধুরী। তিনি ছাত্রশক্তি নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক।
গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট মসজিদ এলাকায় সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন আলিফ। প্রথমে তাকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গত বৃহস্পতিবার সেখানে তার বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, গুরুতর আঘাতে তার বাঁ চোখের আইবল ফেটে যায়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা করা হলেও বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। একই সঙ্গে ডান চোখেও ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা দিয়েছে, যা চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসক সামিয়া নুজহাত জানান, আলিফ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি কী দিয়ে তার চোখে আঘাত করা হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইট বা পাথরের মতো কোনো শক্ত বস্তুর আঘাতে তার চোখের আইবল ফেটে যায় এবং ভেতরের অংশ বাইরে বেরিয়ে আসে। একই সঙ্গে চোখের ওপরের ও নিচের পাতাও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আলিফ নবীগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের ফারুক চৌধুরী ও আতিকা বেগম চৌধুরীর ছেলে। স্থানীয় হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
চার ভাই-বোনের মধ্যে আলিফ সবচেয়ে ছোট। বাবা জন্মগতভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী। পরে এক দুর্ঘটনায় তার একটি পা ভেঙে যায়। মা ও একমাত্র বড় ভাইও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। ফলে পরিবারের একমাত্র সুস্থ ও কর্মক্ষম সদস্য ছিলেন আলিফ। তাকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশা।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে আলিফের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও চোখের ক্ষতি অত্যন্ত গুরুতর। অস্ত্রোপচারের পর তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং পরবর্তী জটিলতা এড়াতে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে এনসিপি জানিয়েছে, আলিফের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় দলটির পক্ষ থেকে বহন করা হচ্ছে। দলের নেতাকর্মীরা নিয়মিত হাসপাতালে গিয়ে তার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
যে চোখে ভর করে একটি অসহায় পরিবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই চোখের আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কায় পুরো পরিবার দিশেহারা। আলিফের পরিবারের সদস্য, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার চিকিৎসা ও পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

