সিলেটে আধিপত্যের লড়াইয়ে কিশোর গ্যাং, শঙ্কিত নগরবাসী

সিলেটে আধিপত্যের লড়াইয়ে কিশোর গ্যাং, শঙ্কিত নগরবাসী

সিলেট নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক সেবন, ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বাড়ছে। নগরীর অন্তত ১৫ পয়েন্টে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তার তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)।

সম্প্রতি তিন দিনের অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৬০ জনকে আটক করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১০ কিশোরকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও বাকিদের বিভিন্ন মামলায় আদালতে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যুবলীগ-ছাত্রলীগের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত গ্যাংগুলোর তৎপরতা কমে এলেও নতুন করে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত নগরী গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অপরাধে জড়িতদের নগরী ছাড়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অব্যাহত থাকার অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।

পুলিশের তালিকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তার উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছেÑআম্বরখানা, চৌহাট্টা, উপশহর, টিলাগড়, মদিনা মার্কেট, তালতলা, দক্ষিণ সুরমা, ধোপাদীঘির পাড় ওয়াকওয়ে, মাছিমপুর, বড় বাজার, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, কাজিটুলা, কুমারপাড়া, শিবগঞ্জ, নয়া সড়ক, মিরাবাজার, ভাতালিয়া-লামাবাজার ও বিমানবন্দরসংলগ্ন বড়শালা এলাকা।

এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ও নারীদের হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কাজির বাজার সেতুতে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনাও কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।

এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলাম জানান, মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও অলিগলিতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ধোপাদীঘির পাড় ওয়াকওয়ে, মাছিমপুর ও উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতভর অভিযান চালানো হয়। এসব এলাকায় দলবদ্ধ আড্ডা, মাদক সেবন ও জুয়া খেলার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

এসএমপির তথ্যানুযায়ী, গত মঙ্গলবার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬১ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকায় ১৮ জন, শাহপরাণ (রহ.) থানায় ১২ জন, বিমানবন্দর থানায় ১১ জন, দক্ষিণ সুরমায় আটজন, জালালাবাদে সাতজন এবং মোগলাবাজার থানায় পাঁচজন রয়েছে। এর দুদিন আগে পৃথক অভিযানে আরো ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই অভিযানে ২৫০ গ্রাম গাঁজা ও ২৬টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে হুমকি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় প্রতিপক্ষকে মারধর বা হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাদের দাপটে পুরো নগরীতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এলাকাভিত্তিক গ্রুপিং থেকে শুরু হওয়া এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ে। প্রতিটি গ্রুপ আলাদা নাম নিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী, বখাটে, মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও কোনো কোনো গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বেকারত্ব, পারিবারিক নজরদারির অভাব, অপরাধচক্রের প্রভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা এসব গ্রুপের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, সময়ের পালাবদলে কিশোররাই এখন অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি দলের প্রভাবশালী বা কোন পর্যায়ের নেতারা তাদের সমর্থন দিচ্ছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অধিকাংশ গ্যাং গড়ে উঠেছে বস্তির বেকার ও বখাটেদের নেতৃত্বে। তাদের অনেকেই নিজেদের সরকারদলীয় সমর্থক বলে দাবি করছে।

কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, পরিবারের নজরদারি বাড়ানো, সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, মাদক ও অপরাধচক্র থেকে দূরে রাখা এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও পৃষ্ঠপোষকতা শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ

সিলেটে কিশোরদের একটি অংশের অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সিলেটে অন্তত ১৫টি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য থাকার কথা উঠে এসেছে। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ও নারীদের হয়রানি থেকে খুনের পর্যন্ত অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের একটি অংশের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তবে গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের বয়স অনেক ক্ষেত্রে ২০ বছরের বেশি। সাধারণ গ্রুপগুলোয় ১৫-২০ জন সদস্য থাকলেও বড় গ্রুপে সদস্যসংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে চোর, মাস্তান, ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী; এমনকি অভিজাত ঘরের সন্তানও রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পশ্চিমা কালচারে অনুপ্রাণিত হয়ে আবার কেউ কেউ এলাকাভিত্তিক গ্যাংয়ের প্রভাবে বাধ্য হয়ে গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে।

এসএমপি জানিয়েছে, অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন