সুনামগঞ্জের ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক প্রশস্তকরণ কাজের শুরুতেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষ এখনই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে না দেখলে সরকারের প্রায় পৌনে ২০০ কোটি টাকা জলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দুর্নীতিবাজরা লাভবান হলেও চরম ভোগান্তিতে পড়বেন এই অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড (ওটিবিএল) প্রায় এক মাস আগে এই সড়ক আধুনিকায়ন ও প্রশস্তকরণ কাজ শুরু করে। গোবিন্দগঞ্জ থেকে ছাতক সুরমা সেতুর চত্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক ২ লেন এবং সেখান থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত ৪ লেনের কাজ চলছে। দুই অংশে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৪ কোটি টাকা।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহারের জন্য মাধবপুর লালপুল এলাকায় প্রায় আড়াই লাখ ব্লক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে শারফিন টিলার মরা লাল পাথরের সঙ্গে ভবন ভাঙার কংক্রিট, নিম্নমানের বালি ও সিমেন্ট দিয়ে প্রায় ২০ হাজার ব্লক তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এছাড়া সড়ক সম্প্রসারণে কর্দমাক্ত মাটি দিয়ে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সাইট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে নদী থেকে ভিটমাটি উত্তোলন করে সড়কে সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। শুধু তাই নয়, সড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনার ওপর ভিটমাটি ফেলে কাজ করা হচ্ছে; যা সামান্য বৃষ্টি বা পানির স্রোতেই ধসে যেতে পারে। এসব কাজের তদারকিতে কোনো সাইনবোর্ডও টানানো হয়নি।
সচেতন মহলের অভিযোগ, শুকনো মাটির পরিবর্তে কাদামাটি দিয়ে সড়ক ভরাটের কাজ চলছে, যা টেকসই সড়কের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। তবে ব্লক তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা বলছেন, ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা কাজ করছেন। এ বিষয়ে তারা এর বেশি কিছু বলতে নারাজ।
এদিকে অবৈধভাবে কৃষি ও সরকারি জমি থেকে কাদামাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে সুরমা নদী থেকে ভিট বালি উত্তোলন করে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কাজীবাজার এলাকায় রাখা হচ্ছে। এসব ভিটমাটি সড়ক প্রশস্তকরণ কাজে সরবরাহ করে অবৈধ ফায়দা হাসিলের অভিযোগ উঠেছে সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা চমক আলীর বিরুদ্ধে। সিলেট, ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ ও জালালাবাদ অংশ থেকে অবৈধভাবে ভিটমাটি উত্তোলনের সঙ্গে চমক আলী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ২০২৫ সালে ছাতকের লালপুল এলাকা থেকে একটি ড্রেজারসহ ড্রেজারের মালিক হাবিবকে আটক করেছিলেন ছাতকের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তরিকুল ইসলাম; কিন্তু পরে তদবির করে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। সম্প্রতি কাজীবাজার এলাকায় ভিটমাটির স্তূপে অভিযান চালান বিশ্বনাথ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিহাব বিন আমিন। শেষ পর্যন্ত সেটিও ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ বিষয়ে বিশ্বনাথের ভূমি কর্মকর্তা জানান, উপস্থিত কাগজপত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি, অন্য কোথা থেকে ভিটমাটি এনে এখানে রাখা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চমক আলী বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ ওয়ার্ক অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে সংগৃহীত এসব ভিটমাটির ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কের সুরমা সেতুর চত্বর (পাগল হাসান চত্বর) পর্যন্ত ২ লেনের মাটি ভরাট ও ভিটমাটি তিনিই সরবরাহ করছেন। তার মাধ্যমে কৃষিজমি থেকেও অনেকে কর্দমাক্ত মাটি সরবরাহ করছেন। এই কাজকে ঘিরে চমক আলীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে চমক আলী বলেন, ‘ছাতক সুরমা সেতুর চত্বর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত শুধু মাটি ভরাটের কাজ আমি করছি। ভিজে মাটির কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ সোমবার রাত থেকে আমার মাটি ভরাট কাজ কয়েক দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। অগ্রহায়ণ মাসের পর আবারও মাটি ভরাটের কাজ শুরু করব।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওটিবিএল-এর ডিপিএম ও গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সুরমা সেতুর চত্বর পর্যন্ত ২ লেন কাজের সাইট ইঞ্জিনিয়ার সজল হাওলাদার বলেন, ‘সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ব্লক তৈরির বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এবং নিয়মিত পানি দিয়ে ধুয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ছাতক সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সাদাৎ হোসেন বলেন, ‘ভোলাগঞ্জের কোয়ারি বন্ধ থাকায় এবং সুনামগঞ্জে সাদা পাথর না পাওয়ায় শারফিনের পাথর দিয়ে ব্লক তৈরি হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাতের বেলা পাথর আসলে পরদিন সকালে তা ধুয়ে ব্লক তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। তার মতে, শতভাগ না হলেও ৯৫ শতাংশ কাজ ভালো হচ্ছে।’
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

