ঋণখেলাপি হওয়ার পরও সিটি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের একটি ধারার নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে আট ব্যাংকের একটি সিন্ডিকেট গ্রুপটির পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে এই ঋণ দিতে পারবে। বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সিটি গ্রুপের ঋণখেলাপি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—সিটি সিড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, সিটি ডাল মিলস লিমিটেড ও শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেডকে ৩ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেটের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক (৩) ধারার নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সুবিধা কার্যকর থাকবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক (৩) ধারায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ সুবিধা পাচ্ছিল না। এবার নির্দিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ওই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ ঋণের বিপরীতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দায় তৈরি হবে না। ভবিষ্যতে সিটি ব্যাংক বা সিন্ডিকেটভুক্ত অন্য কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ঋণের জন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
এ ছাড়া ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে সিটি গ্রুপকে এমন সম্পত্তি বন্ধক দিতে হবে, যা অন্য কোনো ঋণ বা দায়ের বিপরীতে আগে থেকে বন্ধক রাখা হয়নি। ঋণের টাকায় কেনা পণ্য বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। ওই অর্থ থেকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পাওনা আনুপাতিক হারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণের টাকায় আমদানি করা কাঁচামাল ব্যাংকগুলোর সিকিউরিটি এজেন্টের প্রতিনিধির মাধ্যমে কিনতে হবে এবং জামানত হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।
জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ দেবে আটটি ব্যাংক । এর মধ্যে সিটি ব্যাংক লিড অ্যারেঞ্জার এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কো-অ্যারেঞ্জার। বাকি ব্যাংকগুলো হলোÑ প্রাইম ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে সিটি ব্যাংক দেবে ৩০০ কোটি টাকা। বাকি ব্যাংকগুলো ২০০ কোটি টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার জন্য সিন্ডিকেটের বাইরের আরও কয়েকটি ব্যাংকও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের বাইরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকও সিটি গ্রুপকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে।
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের দিকনির্দেশনা এবং সহযোগিতায় ব্যাংক খাতের এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখা এবং বৃহত্তর অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে দায়িত্বশীল উপায়। গ্রাহকদের পাশে থাকতে হবে শুধু তাঁদের ভালো সময়েই নয়, নানা কারণে যখন তাঁরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন, তখনো। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হলো, যা এ ব্যবসায়ী গ্রুপকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে।’
জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখাসহ সাত ধরনের নীতি সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয় সিটি গ্রুপ। পরে ব্যাংকগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) একই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণের বিদ্যমান শ্রেণিমান ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেয়। ফলে ওই সময়ের মধ্যে গ্রুপটির প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হয়নি। তবে সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর বাড়ানো হয়নি। এতে গ্রুপটির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

