বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক দিনও ক্লাস মিস না করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এক শিক্ষার্থী। টানা ছয় বছর একাডেমিক ব্যস্ততা, ক্লাস প্রতিনিধিত্ব, গবেষণা ও টিউশনির মতো দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। এই শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভাগ থেকেও পেয়েছেন সম্মাননা। বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইসহাকের কথা। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। ফার্মেসি বিভাগে পড়ার কারণে অনার্স শেষ করতে তার পাঁচ বছর সময় লেগেছে।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কুদুটি গ্রামে বেড়ে ওঠা নাজমুল ৯ সদস্যের একটি পরিবারে বড় হয়েছেন। তার বাবা একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। শৈশব থেকেই পারিবারিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ তার জীবনে এই নিয়মিততা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অভ্যাস থেকে প্রতিশ্রুতি
নাজমুলের এই অসাধারণ অর্জনের শুরুটা ছিল খুব সাধারণÑছোটবেলা থেকে নিয়মিত ক্লাসে যাওয়ার অভ্যাস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ অভ্যাসই তার ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। একসময় এটি শুধু নিয়ম নয়, বরং নিজের সঙ্গে করা এক দৃঢ় অঙ্গীকারে রূপ নেয়Ñকোনো অবস্থাতেই ক্লাস মিস করা যাবে না। নাজমুল জানান, ‘ক্লাসে উপস্থিত থাকা আমার কাছে শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং এটি দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং শেখার প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন।’ কখনো তিনি ভাবেননি—আজ না গেলেও চলবে। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দিনের ছাড় মানেই ধারাবাহিকতার ভাঙন। এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিদিন নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি শুধু একজন নিয়মিত শিক্ষার্থীই ছিলেন না, নেতৃত্বের ভূমিকায়ও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তৃতীয় বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত টানা চার বছর ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ (সিআর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময়ে ক্লাসের সময়সূচি নির্ধারণ, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পাশাপাশি গবেষণা, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রজেক্ট, মাস্টার্স থিসিস, টিউশনি এবং একাধিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কাজ সমন্বয় করে চলেছেন।
প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প
এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শারীরিক অসুস্থতা। তবে ঝড়-বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়া কখনো তাকে থামাতে পারেনি। বিশেষ করে মাস্টার্সে পড়াকালে প্রায় তিন মাস ধরে তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন। ইনহেলার ব্যবহার, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অতিরিক্ত ঘুম—সবকিছু মিলিয়ে সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
নাজমুল বলেন, ‘পরীক্ষার আগের রাতে হঠাৎ আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও পরদিন আমি নিজেকে সামলে নিয়ে পরীক্ষা ও ক্লাসে অংশগ্রহণ করেছি। চিকিৎসার জন্য অনেক সময় ক্লাস শেষে শহরে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছি। তারপর গভীর রাতে বাসায় ফিরে পরদিন আবার ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি।’
অনুপ্রেরণার প্রতীক এক শিক্ষার্থী
নাজমুলের এই অসাধারণ ধারাবাহিকতা শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে। অনেকেই তাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেছেন, আবার কখনো ঠাট্টা-বিদ্রূপের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও কিন্ডারগার্টেনের মতো নিয়ম মেনে চলা’—এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে তাকে। তবে তিনি এসবকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছেন এবং নিজের লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে আসেননি।
এই অনন্য অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে গত ২ এপ্রিল বিভাগ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এটিকে তিনি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও অটল প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নাজমুল হাসান বলেন, ‘নিয়মিততা, সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই একসময় বড় সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তোলে।’
নাজমুল হাসানের এই কাজের প্রশংসা করে বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. মহি উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সবসময়ই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার জন্য উৎসাহিত করি। কারণ, ক্লাসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি ক্লাস থেকেই কিছু না কিছু শিখতে পারে। নাজমুলের এই ইতিবাচক ও দৃষ্টান্তমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা তাকে ক্রেস্ট প্রদান করেছি। পাশাপাশি, আমরা অন্যান্য শিক্ষার্থীকেও নাজমুলকে অনুসরণ করে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে অনুপ্রাণিত করছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

