বায়েজিদ বোস্তামি ও ভণ্ড দরবেশ

বায়েজিদ বোস্তামি ও ভণ্ড দরবেশ

বোস্তাম শহরে এক ভণ্ড দরবেশ বাস করত। সে নিজেকে খুবই জ্ঞানী এবং উচ্চস্তরের ধর্মপ্রাণ বলে মনে করত, কিন্তু সে তেমন জ্ঞানী ও ধর্মপ্রাণ ছিল না। তার ওপর বায়েজিদ বোস্তামিকে শুধু শুধুই হিংসা করত। তাকে ছোট করে দেখানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করত। তাই মাঝে মাঝেই বায়েজিদ বোস্তামির দরবারে গিয়ে অর্থহীন সব প্রশ্ন করে ভণ্ড দরবেশ তাকে বিপাকে ফেলত। বায়েজিদ বোস্তামি এই ভণ্ড দরবেশের উদ্দেশ্য জানতেন। তবু তিনি তার প্রশ্নের জবাব দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন। তখন ভণ্ড দরবেশ বলত, ‘কী বলব হুজুর, আমি যা জানতে চেয়েছি আপনার জবাব তার ধারেকাছে দিয়েও যায়নি। আসলে সহজ বিষয়কে আপনি আরো কঠিন করে ফেলেন, এটাই আপনার সমস্যা।’

বিজ্ঞাপন

একদিন সেই ভণ্ড দরবেশ বায়েজিদ বোস্তামির কাছে গিয়ে তাকে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল। বায়েজিদ বোস্তামি খুব সহজ করে তার প্রশ্নের জবাব দিলেন। কিন্তু ভণ্ড দরবেশ প্রতিবারের মতোই বলল, ‘আপনি কী বললেন, তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি লোকজনকে বোঝাব কেমন করে? আপনি আরো সহজ আর পরিষ্কার করে বলুন।’

বায়েজিদ বোস্তামি ভালো করেই জানতেন, তিনি যতই সহজ করে বুঝিয়ে বলুন না কেন, লোকটির তা পছন্দ হবে না। সে উল্টোপাল্টা অভিযোগ করেই যাবে। তাই এবার বুদ্ধি করে তিনি বললেন, ‘তুমি তো জানই আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমার জ্ঞান-বুদ্ধি খুবই সীমিত। এর চেয়ে সহজ করে তোমার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। তবে আমার এক জ্ঞানী বন্ধু আছেন, সারা দিন ধ্যান-তপস্যা করেন। তিনি তোমাকে খুব সহজ করে বুঝিয়ে বলতে পারবেন। তুমি তার কাছে যাও।’

ভণ্ড দরবেশ জিজ্ঞেস করল, ‘সেই জ্ঞানী ব্যক্তি কোথায় থাকেন?’

বায়েজিদ বোস্তামি বললেন, ‘শহরের বাইরে যে পাহাড় আছে, ওটাতে একটা গুহা আছে। সেই গুহার ভেতর তিনি বাস করেন। তুমি সেখানে গেলেই তাকে দেখতে পাবে। তিনি আমার চেয়ে সহজ করে বুঝিয়ে বলতে পারবেন।’

বায়েজিদ বোস্তামির কথায় ভণ্ড দরবেশের মনে কৌতূহলের সৃষ্টি হলো। সে আর দেরি না করে জ্ঞানী দরবেশের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের ভেতর সে সেখানে পৌঁছে পাহাড়ের গুহাটি দেখতে পেল। কিন্তু গুহার ভেতর ঢুকতেই বিশাল এক অজগর সাপ হাঁ করে তার দিকে তেড়ে এলো। তবে অজগর ছোবল মারার আগেই ভণ্ড দরবেশ ‘মাগো, বাবাগো’ বলে দৌড়ে কোনো রকমে জীবন বাঁচাল। তারপর বায়েজিদ বোস্তামির কাছে এসে বলল, ‘আপনি তো আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন! সেই গুহার ভেতর আপনার বন্ধু ছিলেন না, সেখানে ইয়া বড় একটা অজগর সাপ ছিল। ওটা আমাকে গিলে খাওয়ার জন্যে তেড়ে এসেছিল। আমি কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি।’

বায়েজিদ বোস্তামি তো সবই জানতেন। তার ইচ্ছাতেই অমন ঘটনা ঘটেছে। তাই ভণ্ড দরবেশের কথা শুনে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, সামান্য একটা সাপ দেখেই তুমি এত ভয় পেয়ে গেছ! এই সাপ যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই আল্লাহর সামনে তুমি দাঁড়াবে কেমন করে? সেদিন তোমার ভয় করবে না?

বায়েজিদ বোস্তামি এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ভণ্ড দরবেশের বুক কেঁপে উঠল। তার ভেতর আমূল পরিবর্তন এলো। সে কেঁদে উঠে বলল, ‘আমি জীবনে অনেক অন্যায় করেছি। আপনার সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছি। এখন আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। হুজুর, আপনি আমাকে তওবা পড়িয়ে পবিত্র করে নিন। আমার জন্যে দোয়া করুন—আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন; বাকি জীবন আমি যেন সৎ পথে চলতে পারি।’

বায়েজিদ বোস্তামি ভণ্ড দরবেশকে তওবা পরিয়ে সৎ পথে আসার জন্যে দোয়া করলেন। তার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে এই ভণ্ড দরবেশ সৎ মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...