আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

হাত ঘুরলেই দাম বাড়ে পাঁচ কৃষি পণ্যের, ‘লাভের গুড়’ খায় মধ্যস্বত্বভোগীরা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

হাত ঘুরলেই দাম বাড়ে পাঁচ কৃষি পণ্যের, ‘লাভের গুড়’ খায় মধ্যস্বত্বভোগীরা

দেশের পাঁচটি কৃষিপণ্য হাত ঘুরলেই দাম বেড়ে যায়। উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য না পেলেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়তি দামের বোঝা চাপছে। মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবে এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কৃষক ও ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামারিরা লোকসানে পড়লেও বড় ব্যবসায়ী ও মিলমালিকরা লাভবান হচ্ছেন।

বুধবার ‘বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা দলের প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় বলা হয়, চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—এই পাঁচটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট লক্ষ্য করা গেছে। পাশাপাশি দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা প্রধান ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গবেষণাটি দুটি ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপ ছিল ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই। দ্বিতীয় ধাপে ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলায় ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত আগস্টে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ ৮৭২ টাকা হলেও বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২৫ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। কৃষকের মুনাফা থাকলেও চালের বাজার পুরোপুরি মিলারনির্ভর। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায়। মিলাররা চালের পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করছেন, যা ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়াচ্ছে।

আলুর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আরো স্পষ্ট। কৃষকের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১০.৬৩ টাকা হলেও কৃষক বিক্রি করেন ১৮.৪৪ টাকায়। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজ থেকে বের হওয়ার পর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২৮.৮০ টাকা এবং খুচরা বাজারে তা পৌঁছে ৪৫.৮০ টাকায়। গবেষণায় বলা হয়, কোল্ড স্টোরেজ গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফাই আলুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিমাগারের কেজিপ্রতি ৬.৭৫ টাকা ভাড়া কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

পেঁয়াজের বাজারে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ওজন হ্রাস। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ ১৯.২৪ টাকা হলেও খুচরা বাজারে দাম ওঠে ৮০.৭৫ টাকায়। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে প্রতি মণে প্রায় ১২ কেজি ওজন কমে যাওয়ায় অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এতে প্রতি কেজির দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকায় ওঠার শঙ্কা থাকে। যদিও গবেষণায় পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পোল্ট্রি খাতেও মধ্যস্বত্বভোগী ও ফিড মিল মালিকদের প্রভাব স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৬৩.৫৩ টাকা হলেও খামারিরা বিক্রি করেন ১৭২.১৮ টাকায়, যা খুচরা বাজারে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯৫.৩৩ টাকায়। খাবারের খরচই মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ। জরিপের সময় অনেক খামারি প্রতি কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত লোকসান করেছেন। বিপরীতে ফিড মিল মালিকরা লোকসানের বাইরে থেকে লাভবান হচ্ছেন।

ডিম উৎপাদনেও একই চিত্র দেখা গেছে। একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৯.৪৭ টাকা হলেও খামারি বিক্রি করেন ১০.২৬ টাকায়, আর খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ১১.৭৭ টাকায়। উৎপাদন খরচের প্রায় ৮৫ শতাংশই খাবারের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে ছোট খামারিরা অফ-সিজনে ক্ষতির মুখে পড়েন।

এই পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আলু ও পেঁয়াজের জন্য উন্নত ও বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তার কার্যকর বাস্তবায়ন, ফিডের দাম নিয়মিত মনিটরিং এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল চালু করা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...