তারল্য সংকটে থাকার কারণে প্রিমিয়ার ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তিন মাসের জন্য এই অর্থ ধার দিলেও ব্যাংক তা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার পরিশোধের জন্য আরো তিন মাস সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রিমিয়ার ব্যাংককে নগদে এক হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডের মাধ্যমে চার হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে। এ অর্থ চলতি মাসের ২ মে তা পরিশোধের কথা ছিল। তবে ব্যাংকের তারল্য সংকট উত্তরণ না হওয়ার কারণে তা পরিশোধ করতে পারেনি। যদিও ধারের বিষয় তিন মাসে যে পরিমাণ সুদ এসেছে তা ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিশোধ করেছে।
জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনজুর মফিজ বলেন, ধারের পাঁচ হাজার কোটি টাকা মেয়াদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাড়ানো হয়েছে। তবে তিন মাসে সুদ বাবদ ১৪২ কোটি টাকা কেটে নিয়েছে। আমরা আশাবাদী আস্তে আস্তে টাকা ফেরত দিয়ে কমিয়ে ফেলব।
যেভাবে দেওয়া হলো এই অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬ (৪) (ডি) এবং ১৭ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ দেওয়া হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা বলা হয়। এই ধারের বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের ‘ডিমান্ড প্রমিসরি নোট’ জমা দিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো কারণে ব্যাংকটি অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এর আগে শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হওয়ার তালিকায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকও একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থসহায়তা নিয়েছিল। তবে এসব ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ধারের অর্থ পরিশোধে কয়েক দফায় ব্যর্থ হয়েছে।
সংকটের নেপথ্যে
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন এইচবিএম ইকবাল। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটির পর্ষদে তার পরিবারের সদস্যদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের একটি শাখাসহ বেশ কিছু শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করায় ব্যাংকটি আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ সংকটে ছিল।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের আমানত তুলে নিলে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ফলে ব্যাংকটি সিআরআর (বিধিবদ্ধ নগদ জমা) ও এসএলআর (সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ) সংরক্ষণেও ব্যর্থ হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংককে তাদের দায়ের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণ ছিল ৩৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ সময় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল আট হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এছাড়া মূলধন ঘাটতি ছিল চার হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।
জানা গেছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে প্রভিশন ঘাটতির বিপরীতে ৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা দেওয়া হয়। এ সুবিধা পেয়েও ব্যাংক ১২৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এইচবিএম ইকবালের সময় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটির এমন পরিস্থিতি হয়েছে। এ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গত বছরের আগস্টে পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

