বিশ্বে তৈরি পোশাক বাজারে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্যের চাহিদা ও বাণিজ্য বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত বেসিক পোশাকনির্ভর। ২০২৫ ক্যালেন্ডার বছরে দেশের ৩৮ হাজার ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭৭ শতাংশ এসেছে বটমওয়্যার, টি-শার্ট, সোয়েটার, ইনারওয়্যার, শিশুদের পোশাক ও ছোট অ্যাকসেসরিজের মতো মৌলিক পণ্য থেকে। অথচ বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের সম্মিলিত অংশ ৬১.৫৮ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির এ কাঠামোগত চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় চার লাখ ২৬ হাজার মিলিয়ন ডলারের। এর বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৩৮ হাজার ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের।
বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে আছে বটমওয়্যার (ট্রাউজার, শর্টস, স্কার্ট)। মোট পোশাক রপ্তানির ৩৩.৬৮ শতাংশ এ শ্রেণির পণ্য থেকে এসেছে, যার মূল্য প্রায় ১৩ হাজার ৭৬ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে বটমওয়্যারের অংশ ২১.৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ, বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এ পণ্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নির্ভরশীল।
টি-শার্টেও একই প্রবণতা দেখা যায়। দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে এ পণ্যের অংশ ১৮.৬৪ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৭,২৩৭ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে টি-শার্টের অংশ ১০.০৯ শতাংশ। বটমওয়্যার ও টি-শার্ট মিলিয়েই বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি আসে এ খাত থেকে ।
বেসিক পোশাকের ওপর এই নির্ভরতার বিপরীতে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। আউটারওয়্যার, ড্রেস, টেকনিক্যাল ওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও স্যুট—এ পাঁচ শ্রেণির পণ্যকে অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরি হিসেবে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে এসব পণ্যের সম্মিলিত অংশ মাত্র ৯.৩৫ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৩,৬৩০ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে একই শ্রেণির পণ্যের অংশ ৩০.৪৬ শতাংশ বা প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ডলার।
বিশেষ করে আউটারওয়্যারে ব্যবধানটি সবচেয়ে স্পষ্ট। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে এ পণ্যের অংশ ৩.৮৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১,৪৮৭ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে এর অংশ ১৩.৪৫ শতাংশ বা প্রায় ৫৭ হাজার ২৯৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারের সবচেয়ে বড় পোশাক ক্যাটাগরিগুলোর একটি হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এর উপস্থিতি সীমিত।
শার্ট ও ব্লাউজ নিয়ে গঠিত সেমি-বেসিক ক্যাটাগরিতেও বাংলাদেশের অংশ বিশ্ববাজারের চেয়ে বেশি। দেশের রপ্তানিতে এ শ্রেণির অংশ ১০.৩৩ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় চার হাজার ১১ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে এর অংশ ৭.৩৮ শতাংশ।
তবে সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যায় ছোট অ্যাকসেসরিজে। বাংলাদেশের রপ্তানিতে এ শ্রেণির অংশ মাত্র ০.৩৫ শতাংশ বা প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে এর অংশ ৭.৫২ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৩২ হাজার ৩৫ মিলিয়ন ডলার। পোশাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উচ্চমূল্যের অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে এখানেই।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনো টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ তুলনামূলক কম মূল্যের পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজারে স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল ও সিনথেটিক পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। এ বাজার ধরতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি কাপড় উৎপাদন, ডাইং, ফিনিশিং, ডিজাইন ও পণ্য উন্নয়নে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। তাই বিদ্যমান বেসিক পণ্যের শক্ত অবস্থান ধরে রেখে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের অংশ বাড়ানো জরুরি। এতে একই পরিমাণ রপ্তানিতেও বেশি আয় করা সম্ভব হবে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩.৩৮ শতাংশ বা প্রায় ১,৩১২ মিলিয়ন ডলারের তথ্য নির্দিষ্ট এইচএস-৬ শ্রেণির সঙ্গে মেলেনি। ইপিবির দুই অঙ্ক ও ছয় অঙ্কের তথ্যের মধ্যে থাকা এ ব্যবধান বৈশ্বিক তথ্যের অমিলের তুলনায় বড়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের বর্তমান রপ্তানি কাঠামো পরিমাণনির্ভর বেসিক পণ্যের ওপর বেশি কেন্দ্রীভূত। বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের পোশাকের অংশ যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় বাড়াতে শুধু প্রচলিত পণ্যের উৎপাদন সম্প্রসারণ নয়, বরং আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল পোশাক, ড্রেস, স্যুট ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকসেসরিজে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে একইসঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে এবং বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের বড় অংশে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


