৩০% লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

৩০% লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়ের ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসাবে বিতরণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থবিল ২০২৬-এ রিটেইনড আর্নিংস বা সংরক্ষিত আয় এবং রিজার্ভে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ২২-এ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে ব্যাংক, বীমা ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লভ্যাংশ বিতরণের বাধ্যবাধকতা থেকে এ অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কর-পরবর্তী মুনাফা রিটেইনড আর্নিংস বা রিজার্ভে স্থানান্তরের জন্য কোনো ধরনের কর দেওয়া লাগবে না। বর্তমানে স্থানান্তরের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রযোজ্য রয়েছে। ফলে রিটেইনড আর্নিংস বা রিজার্ভে অর্থ স্থানান্তরের কারণে কর দেওয়া থেকে অব্যাহতি পাবে ব্যাংক, বীমা ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি জারি করা এক সার্কুলারে দুই হাজার কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনী ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকই শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারবে না। মূলত ব্যাংকগুলো আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণে লভ্যাংশ বিতরণে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রস্তাবিত অর্থবিল, ২০২৬-এ ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি অপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ বিতরণের বাধ্যবাধকতায় ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় লভ্যাংশ বিতরণে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল। অপরদিকে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত তালিকাভুক্ত সাধারণ কোম্পানিগুলোর জন্য কর গণনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে অর্থবিলে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি যদি তার নিট মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রিজার্ভে স্থানান্তর করে, তবে পুরো স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মুনাফার ৭০ শতাংশ সীমা অতিক্রম করলে শুধু অতিরিক্ত বা উদ্ধৃত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

একটি উদাহরণ দিয়ে পরিবর্তনটি বোঝা যাক (সাধারণ কোম্পানির ক্ষেত্রে)। ধরা যাক, একটি কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। কোম্পানিটি ২০ শতাংশ বা ২ লাখ টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে এবং ৮০ শতাংশ বা আট লাখ টাকা রিজার্ভে স্থানান্তর করেছে। যেহেতু কোম্পানির ৩০ শতাংশ বা ৩ লাখ টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১০ শতাংশ বা ১ লাখ টাকা কম লভ্যাংশ বিতরণ করে মুনাফার ৮০ শতাংশ বা ৮ লাখ টাকা রিটেইনড আর্নিংস বা রিজার্ভে স্থানান্তর করা হয়েছে। এজন্য অতিরিক্ত স্থানান্তরকৃত এক লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। বর্তমান নিয়মে পুরো আট লাখ টাকার ওপরই ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হয়। সে হিসাবে বর্তমান নিয়মে স্থানান্তরকৃত পুরো ৮০ লাখ টাকায় করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত নিয়মে কর দিতে হবে শুধু অতিরিক্ত ১ লাখ টাকার ওপর এবং করের পরিমাণ হবে ১০ হাজার টাকা। ফলে কোম্পানিগুলোর ওপর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া আমার দেশকে বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ কোম্পানিগুলোর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এটি ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতে এবং কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পুনর্নিয়োগে উৎসাহিত করবে। এছাড়া তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য লভ্যাংশ প্রদানের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ায় তাদের মূলধন কাঠামো আরো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।

রিটেইনড আর্নিংস হলো ব্যবসার সঞ্চিত তহবিল, যা যেকোনো সময় ব্যবসার প্রয়োজনে যেকোনো খাতে ব্যয় করা যায়। এটি অনেকটা একটি সাধারণ সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের মতো। অপরদিকে, রিজার্ভ হলো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আলাদা করে রাখা তহবিল (যেমন- ইমার্জেন্সি ফান্ড বা মেশিন কেনার তহবিল)। রিজার্ভের টাকা অন্য কোনো সাধারণ কাজে চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, কারণ এটি বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন