শিল্পের সংকট উত্তরণে বিকল্প সুপারিশ

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবি বিসিআইয়ের

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবি বিসিআইয়ের

শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণির গ্যাসের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। সংগঠনটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে শুনানি-পরবর্তী লিখিত মতামত জমা দিয়ে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি দেশের শিল্প, ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এ ধরনের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প খাত টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে, বিনিয়োগ হ্রাস পাবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে।

বিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পেট্রোবাংলা ও এর অধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি শুধু আমদানি করা এলএনজির ভিত্তিতে নতুন সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ট্যারিফ বৃদ্ধির যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২৩ সালে গ্যাসের একতরফা মূল্যবৃদ্ধির পরও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি, বরং শিল্প খাতে ৩০-৪০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে সিরামিক, স্টিল, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল শিল্প খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ভালুকা, নরসিংদীসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিছু কিছু শিল্পের উৎপাদন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে শিল্পমালিকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন।

বিজ্ঞাপন

২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। শিল্পের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ থাকলেও ডিসেম্বরে তা আরো কমে ৭ শতাংশ ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) গত ছয় মাসে ৭১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতে উৎপাদনব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন, যা রপ্তানি আয় হ্রাসের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিসিআইয়ের মতে, এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় কমানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তিতাস গ্যাসের ১৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ সিস্টেম লস হ্রাস করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়েই সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাসহ অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, এলএনজি আমদানিতে দ্বৈত ভ্যাট ও উৎসে কর প্রত্যাহার, সরকারের পক্ষ থেকে আরোপিত বিভিন্ন ট্যাক্স ও পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত চার্জ কমানো হলে শিল্প খাতের ওপর চাপ কমবে এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।

বিসিআই আরো উল্লেখ করেছে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি সংবিধান ও বিদ্যমান গ্যাস আইন ২০১০-সালের পরিপন্থী। সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, যা এই প্রস্তাব লঙ্ঘন করছে। কারণ, প্রস্তাবিত গ্যাসের নতুন মূল্যহার শুধু সংযোগ পাওয়ার সময়ের ওপর ভিত্তি করে বৈষম্যমূলকভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, যা শিল্প খাতের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করবে। একই শ্রেণির গ্রাহকদের মধ্যে বৈষম্যমূলক মূল্যহার কোনোভাবেই সংবিধানসম্মত নয় এবং এটি শিল্প খাতকে সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ২০২৩ সালে গ্যাসের দাম একতরফাভাবে বাড়ানো হলেও প্রতিশ্রুত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। বরং শিল্পকারখানাগুলো চাহিদার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম গ্যাস পেয়েছে, যা উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ কম থাকার কারণে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অথচ গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। এর ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বেড়ে গেছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিসিআই জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি বাতিল করা হোক এবং শিল্প ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গ্যাসের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হোক। তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করে শিল্প খাত রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। শিল্প খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে দেশের অর্থনীতি আরো গতিশীল হয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন