২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আনা হবে

২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আনা হবে
ফাইল ছবি

দেশের প্রান্তিক এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় চার কোটি মানুষকে এই সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে আনা হবে। আমার দেশ-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান এসব কথা জানান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবু আলী

আমার দেশ : পেনশন ব্যবস্থা চালুর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?

বিজ্ঞাপন

ড. মো. সুরাতুজ্জামান : এই পেনশন ব্যবস্থা চালুর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় (বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়সিরা), তখন তাদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের (খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা) ব্যবস্থা করার কথা সরকারের।

তবে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এখনো এত উন্নত নয় যে, সবাইকে বিনামূল্যে সব ভাতা দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। তাই উন্নত বিশ্বের (যেমনÑআমেরিকা, সুইডেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) মতো কন্ট্রিবিউটরি (অবদানমূলক) পেনশন ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যাতে মানুষ নিজে কিছু অবদান রেখে ৬০ বছর বয়সে গিয়ে পেনশন পেতে পারে। বর্তমানে আমাদের চারটি স্কিম চালু রয়েছে।

আমার দেশ : বর্তমানে চারটি স্কিমে গ্রাহকসংখ্যা এবং ফান্ডের জমার পরিমাণ কত?

ড. সুরাতুজ্জামান : বর্তমানে চারটি স্কিমে (প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস) গ্রাহকের সংখ্যা তিন লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৫ এবং ফান্ডের জমার পরিমাণ ২৯১ কোটি ১৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

আমার দেশ : এই ফান্ডের টাকা কতটুকু নিরাপদ?

ড. সুরাতুজ্জামান : ফান্ডের এই টাকা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্যারান্টিযুক্ত। আমরা এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকি, যা সরকার কর্তৃক সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিয়ে থাকে এবং অত্যন্ত সিকিউর। পেনশন তহবিল পরিচালনার প্রশাসনিক ব্যয় সরকার বহন করে। ফলে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা সরাসরি গ্রাহকের হিসাবে জমা হয়। মাসিক চাঁদার বিপরীতে কর রেয়াত এবং প্রাপ্ত পেনশনের ওপর আয়করমুক্ত সুবিধাও রয়েছে।

আমার দেশ : প্রতিবছর বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের কী হারে লভ্যাংশ বা মুনাফা দেওয়া হয়?

ড. সুরাতুজ্জামান : আট শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা প্রসপেকটাসে উল্লেখ থাকলেও মূলত বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত প্রফিট মার্জিনের ওপর ভিত্তি করে লভ্যাংশ দেওয়া হয়। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হার ১১.৭২ শতাংশ।

আমার দেশ : জমা করা অর্থের এই মুনাফা কি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি?

ড. সুরাতুজ্জামান : অবশ্যই বেশি। বর্তমান মূল্যস্ফীতি আট থেকে ৯ শতাংশের কাছাকাছি হলেও আমাদের দেওয়া মুনাফার হার তারচেয়ে অনেক বেশি।

আমার দেশ : প্রান্তিক মানুষ (যেমনÑরিকশাচালক, শ্রমিক, কৃষক) এই পেনশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের বাধা রয়েছে এবং তাদের জন্য আপনাদের কী উদ্যোগ রয়েছে?

ড. সুরাতুজ্জামান : প্রান্তিক মানুষের আয়ের কোনো ঘাটতি না থাকলেও প্রধান বাধাটি হলো সচেতনতার অভাব (এওয়ারনেস)। এ বিষয়ে আমরা রুট লেভেলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বক্তব্য ইউটিউব, দৈনিক পত্রিকা ও বিভিন্ন মেলায় প্রচার করা হচ্ছে। জেলা-উপজেলায় সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত কয়েক মাসে আমাদের ফেসবুক ভিউ তিন হাজার থেকে বেড়ে ২৬-২৭ হাজারে উন্নীত হয়েছে। আশা করি আগামীতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা না বাড়লেও সম্পৃক্ততা বাড়বে।

আমার দেশ : সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বা ভবিষ্যতে ফান্ড নিয়ে মানুষের মাঝে কোনো আশঙ্কা বা ভীতি আছে কী?

ড. সুরাতুজ্জামান : অতীতে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অনেক ব্যাংক-বীমা ও করপোরেশনের তহবিল তছরুপ হলেও এই পেনশন তহবিলে কেউ হাত দিতে পারেনি। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মতো ফান্ড তখনো সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারে পেনশন ফান্ড গঠনের কথা বলা থাকায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত পজিটিভ ইঙ্গিত দিয়েছে। সুতরাং আগামী দিনে এটি আরো ভালোভাবে কার্যকর হবে।

আমার দেশ : প্রবাসীদের টাকা পাঠানো ও স্কিমে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা রয়েছে এবং তা নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

ড. সুরাতুজ্জামান : প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর জটিলতা দূর করতে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ও গ্রিসের হাইকমিশনারের সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে। কীভাবে প্রক্রিয়াটি সহজ করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের সব দূতাবাসে পররাষ্ট্র সচিবের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রবাসীরা এই প্রবাস স্কিমে সহজে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকে বাংলা কিউআর কোড চালু করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে যাতে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জমানো টাকা সহজে জমা হতে পারে, সে বিষয়ে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

আমার দেশ : প্রিমিয়াম বা কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে টাকা তোলার কোনো বিধান আছে কী?

ড. সুরাতুজ্জামান : বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা তোলার বিধান নেই। চাঁদাদাতাদের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখার বিষয়ে সবশেষ সভায় আলোচনা হয়েছে। ন্যূনতম পাঁচ বছর চাঁদা জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত শর্তে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি অ্যাকচুয়ারিয়াল গাইডলাইনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আমার দেশ : এই ফান্ডে বর্তমানে কী কী সংস্কার আনা হচ্ছে?

ড. সুরাতুজ্জামান : বেশকিছু সংস্কার আনা হয়েছে। যেমনÑপূর্বে নমিনির বয়সসীমা ৭৫ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ থাকলেও তা বাড়িয়ে ৮০ করা হয়েছে। এছাড়া সব স্কিমে শরিয়াহভিত্তিক ভার্সন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকরা কাজ করছেন। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বিধিমালা প্রণয়নের পর এটি চালু করা হবে।

আমার দেশ : ২০৩০ সালে এই ফান্ডকে কোথায় দেখতে চান বা লক্ষ্যমাত্রা কী?

ড. সুরাতুজ্জামান : অর্থমন্ত্রী বাজেট মিটিংয়ে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা এটি প্রত্যেকের ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। অর্থাৎ, প্রতি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে এই পেনশনের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। এটি বাস্তবায়ন হলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা চার কোটিতে পৌঁছাবে।

আমার দেশ : সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আপনার কিছু বলার আছে?

ড. সুরাতুজ্জামান : যেহেতু এটি একটি আর্থিক সুরক্ষামূলক চেতনা, তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও দরিদ্র শ্রেণিসহ সব শ্রেণির মানুষকে এই পেনশনের আওতায় আনা গেলে তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা বাড়ানো। যেহেতু এটি একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, তাই অনেকেই এর সুফল সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি অবগত নন। আমরা বিশ্বাস করি সময়ের সঙ্গে সফল বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা ও নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে। বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়া উচিত। অল্প অল্প করে নিয়মিত সঞ্চয়ই ভবিষ্যতের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন