আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

১২ ব্যাংককে ৬৮ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়ে ফেরত পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রোহান রাজিব

১২ ব্যাংককে ৬৮ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়ে ফেরত পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লুট করা হয়েছিল ডজন খানেকের বেশি ব্যাংক। এসব লুটপাটে জড়িত ছিল এস আলমসহ কয়েকটি গ্রুপ। লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্রাহকের আমানতের অর্থও তারা ফেরত দিতে পারছে না।

এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আমল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যন্ত টাকা ছাপিয়ে ১২টি ব্যাংককে ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময় দেওয়া হয় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় দেওয়া হয় ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ তিন মাসের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে বছর পার হয়ে গেলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

ধার পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলে প্রথম পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এসব ব্যাংক তাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়। এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। দুই যুগ ধরে প্রিমিয়ার ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল এইচ বি এম ইকবালের পরিবার।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণে সংকটে পড়েছে—এটি সত্য। তবে যেভাবে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। এভাবে টাকা ছাপিয়ে দিয়ে কতদিন ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিছু ব্যাংক একীভূত করা হলেও অগ্রগতি খুবই কম।

সংকটের নেপথ্যে

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ব্যাংক খাতের ক্ষত। তবে ২০২২ সালের শেষদিকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির খবর গণমাধ্যমে আসতে শুরু করে। তখন ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকরা অর্থ তুলে নিতে শুরু করে। এতে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলো বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য সংরক্ষণ হিসেবে সিআরআর ও সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর রাখতেও ব্যর্থ হয়। এরপরও ব্যাংকগুলোকে নানা অবৈধ সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখেন তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের একটি চলতি হিসাব থাকে। এ হিসাব থেকে ব্যাংকের বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য সংরক্ষণ হিসেবে সিআরআর ও সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর রাখতে হয়। আবার আন্তঃব্যাংক লেনদেন নিষ্পত্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া পুনঃঅর্থায়নসহ যাবতীয় লেনদেনও হয় এ হিসাব থেকে। সাধারণভাবে সিআরআর ও এসএলআরে ঘাটতি হলেও চলতি হিসাবে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। তবে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ছিলসারা দেশে এমন ব্যাংকগুলোতে ঋণযোগ্য তহবিল শেষ হওয়ার পর সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ বেআইনিভাবে লেনদেনের সুযোগ দেন। ২০২২ সালের শেষদিকে শরিয়াহ্‌ভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের চলতি হিসাব ঋণাত্মক করে লেনদেনের নতুন এ উপায় বের করা হয়। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা বাধায় লেনদেন চালিয়ে গিয়েছিল ব্যাংকগুলো।

তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে বেআইনি সব সুবিধা বন্ধ করে দেন। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে আগের মতো টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণাও দেন। তবে এই সিদ্ধান্তে বেশিদিন অটল থাকতে পারেননি তিনি। কারণ, চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়া বন্ধ করায় গ্রাহককে টাকা দিতে হিমশিম খায় ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর শাখায় শাখায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হলে আবারও নতুন করে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোন ব্যাংকের কত ধার

টাকা ছাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ধার দিয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে। ব্যাংকটির ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংককে পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়। এর বাইরে এবি ব্যাংককে চার হাজার ২৭০ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে তিন হাজার তিন কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬২৪ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংককে ১৯৫ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়।

যেভাবে দেওয়া হলো এই অর্থ

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬ (৪) (ডি) এবং ১৭ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা বলা হয়। এই ধারের বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের ‘ডিমান্ড প্রমিসরি নোট’ জমা দেয়। শর্ত অনুযায়ী, কোনো কারণে ব্যাংকগুলো অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

যা বললেন অর্থনীতিবিদ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী আমার দেশকে বলেন, ব্যাংকগুলো বর্তমানে এতটাই দুর্বল, নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই । তবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাও জরুরি, কারণ তা না হলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ সহায়তা দিচ্ছে।

বর্তমান সহায়তাকে ইনফেকশনে মলম লাগানোর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ইনফেকশন সিরিয়াস হলে যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, তেমনি ব্যাংকগুলোরও মূল সমস্যা সমাধান করা দরকার। টাকা ছাপিয়ে দেওয়া একটি সাময়িক উপশম মাত্র, যা মূল সমস্যা দূর করে না। খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মতো মূল সমস্যাগুলো দূর করার পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংকগুলো কখনোই সবল হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা দিতেই থাকবে এবং তা খরচ হতে থাকবে, কিন্তু এর দ্বারা কোনো স্থায়ী ফল আসবে না। সমাধান হিসেবে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, যারা ব্যাংক লুটপাটের জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাদের সম্পদ থেকে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করতে হবে। এভাবে টাকা ছাপিয়ে সাহায্য করা চলতে থাকলে তা মূল্যস্ফীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে । দায়ীদের শাস্তির আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না এবং সমস্যারও সমাধান হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন, এভাবে তারল্য সহায়তা দেওয়া আর ঠিক হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রকার বাধ্য হয়ে এসব সহায়তা দিচ্ছে। কারণ আমানতকারীরা অর্থ ফেরত না পেলে ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে। এতে করে সংকট আরো গভীর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়েছেন। এখনো ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বোঝা যাবে ব্যাংকগুলো নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন