যে সমস্যা এড়ানোর উপায় নেই

যে সমস্যা এড়ানোর উপায় নেই

জনজীবনের চলমান সমস্যার নিগূঢ় কারণ বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ বাতলানোর চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশার আলোচনাই বেশি দেখা যায় জনপরিসরে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং যানজট সে রকম কিছু ইস্যু। এগুলোর বাইরেও কিন্তু বড় বড় জাতীয় সমস্যা আছে, তবে তা অনেকেরই মনোযোগে আসে না।

তাহলে বারোটি বিষাক্ত ফলমূল নিয়ে পরিবেশবাদীদের ‘ডার্টি ডজন’ তালিকার মতো দেশ, সমাজ ও গণমানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কিছু সমস্যা বা সংকটের একটি ত্রৈমাসিক ফর্দ তৈরি করলে ক্ষতি কী?

বিজ্ঞাপন

সেই চর্চাটি করা হলে নাগরিকরা সমকালীন জনসমাজের প্রধান সমস্যাগুলো গভীরভাবে বুঝতে এবং জোর গলায় সমাধান দাবি করতে পারতেন। তাতে গণতান্ত্রিক সরকারের ভেতর কোনো দ্বিধা থাকত না এবং তার পক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও রাজনৈতিকভাবে সহজতর হতো।

আজকের বাংলাদেশেও কয়েকটি সমস্যা জনগণকে কষ্ট দিচ্ছে, সরকারি কর্তৃপক্ষকে ভাবিত করেছে। কিছু কিছু সমস্যা এমন যে দক্ষিণ আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে উটপাখিদের চোখ বন্ধ করে ডিম লুকিয়ে রাখার মতো আচরণ করার জো নেই।

আধুনিক রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে জনজীবনে দুর্ভোগ বা গণরোষের ইস্যুগুলো অস্বীকার করার কিংবা নিদেনপক্ষে এড়িয়ে চলার আমলাতান্ত্রিক প্রবণতা থাকে, যদিও তাতে লাভ হয় না আখেরে। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার তো গলাবাজি করে এবং জুলুমশাহি ব্যবস্থার জোরে এর ব্যর্থতা ও অপকর্ম চাপা দিতে চেয়েছিল কিয়ামত পর্যন্ত। পেরেছিল জুলাই ২০২৪ বিপ্লবের আগ পর্যন্ত।

এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। এখনকার অধিকাংশ সমস্যা এ আমলে তৈরি করা নয়; নির্বাচনি ম্যান্ডেট ও গণভোটের শক্তিতে তার সরকারের সুযোগ আছে পূর্ববর্তী আয়োজন, ব্যবস্থা ও দেশি-বিদেশি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের।

বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট হয়েছে এবং আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি যে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি, সেসব বিষয়ে দেশবাসীকে জানানো দরকার। মানুষ এটাও প্রশ্ন করবে বা হয়তো করছে যে হাসিনার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকট হয়নি কেন? ট্রাম্প ও নাতানিয়াহুর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষিতে জ্বালানি আমদানির বিকল্প পরিকল্পনা বা উৎস কী?

একটি দীর্ঘ দুঃশাসন এবং বিপ্লবের মাধ্যমে তা অবসানের পর সমাজে যে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষেত্রভেদে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, তা জনগণকে বলতে ও তাদের সহযোগিতা চাইতে হবে। একই সঙ্গে চাঞ্চল্যকর অপরাধমূলক ঘটনা বারবার ঘটলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের আস্থা কমবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা উঠবে—এটা স্বাভাবিক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় ক্ষমতাকেন্দ্রের মানুষ বিরক্ত হতে পারেন কিন্তু যদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারায় সবার আয় বাড়ত এবং সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি থাকত, তখন কী এত কথা হতো? যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট এবং যাত্রী-ড্রাইভারদের ক্লান্তি সত্যিই তো নগরজীবনের এক হতাশাজনক সমস্যা। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী?

অন্যদিকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হওয়ার জন্য যখন ব্যাপক বিনিয়োগ ও জনগণের মধ্যে উদ্দীপনা আনা জরুরি, তখন উল্টো কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এমনকি কৃষি কার্যক্রম চালু রাখা দায় হয়ে পড়েছে। ব্যাংক এবং আর্থিক খাতে জালিয়াতি ও কুশাসনের দায় ভোগ করতে হচ্ছে আমানতকারী, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং করদাতাদের। এর প্রতিকার কী?

সার্বিক পরিস্থিতি দাঁড়াচ্ছে এই যে, আর্থিক সংকটের কারণে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না; জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; ফলে ব্যবসা ও রপ্তানি খাত সংকোচনের মুখে পড়েছে; এ অবস্থায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিতই থাকছে এবং রাজস্বের অপ্রতুলতায় আর্থিক সমস্যা নিরসনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ যেন এক অনুন্নয়নের দুষ্টু চক্র!

এ ধরনের অচলায়তন ভাঙার কাজটি করতে হয় সরকারকেই—তা সমাজতান্ত্রিক, মুক্তবাজার অর্থনীতির, গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র কিংবা স্বৈরাচারী, যে ধরনের ব্যবস্থাই হোক। ইতিহাসের এক জটিল সময়ে এ দায়িত্বটি পড়েছে বর্তমান বিএনপি সরকারের কাঁধে।

জনতার সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা এমনিতেই বেশি থাকে; তার ওপর ২০২৪-এর বিপ্লব জনআকাঙ্ক্ষা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে, নতুন প্রজন্মকে সামনে এনেছে এবং দেশ এক উত্তরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আমরা এখনো পরিষ্কার জানি না আজকের তরুণরা বেকারত্ব বা কিছু একটা উদ্যোগ নিতে গিয়ে বাধা পেলে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এই প্রজন্মগত বোঝাপড়ার ঘাটতি অনেক বড় মনে হতে পারে, যদি আমরা দেড় দশকের পুঞ্জীভূত সমস্যাকে আমলে নিই।

কেউ বলতে পারেন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ না করলে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উন্নতি ঘটানো যায় না; তবে এ জাতীয় বক্তব্য সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বেই থেকে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, জনদুর্ভোগের জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী এবং কেন সমাধান হচ্ছে না।

দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে জনগণের সমস্যা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই। সমস্যা যত আর যত বড়ই হোক, তা উত্তরণে প্রয়োজন হয় সুষ্ঠু রাষ্ট্রীয় নীতি, সুস্থ রাজনীতি এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের উদ্যমী কার্যক্রম।

লেখক : সাংবাদিক

khawaza@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন