পর্ষদবিহীন ইসলামী ব্যাংকে সিদ্ধান্তে ধীরগতি

পর্ষদবিহীন ইসলামী ব্যাংকে সিদ্ধান্তে ধীরগতি

বিতর্কের মুখে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর বর্তমানে ব্যাংকটির পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন। তবে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকায় বড় ধরনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন করপোরেট গ্রাহকেরা। এর প্রভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা, ঋণ নবায়ন এবং চলতি মূলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) অনুমোদন বিলম্বিত হচ্ছে। যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, সংকট কাটিয়ে উঠতে সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠিত হলে কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এখনো কয়েকশ পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এলসি খোলা এবং চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন পাচ্ছে না। কেউ কেউ এলসি খুলতে গিয়ে বিলম্বের মুখে পড়ছেন। এতে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের ভালো গ্রাহকদের একটি অংশও ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমার চারটি গার্মেন্টস কারখানার বেতন-ভাতা পরিশোধ ও এলসি ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে চার হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন ধরে যেসব কর্মকর্তা আমার ফাইল দেখতেন, তারাও নিজেদের অসহায় বলে জানাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর ব্যাংকের সহযোগিতা না পাওয়ায় চাপ আরো বেড়েছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে। বেতন না পেলে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামতে পারেন, যা সরকারের জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।’

ব্যাংকটির একাধিক বড় করপোরেট গ্রাহক জানান, বড় অঙ্কের ঋণ, এলসি অনুমোদন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তের জন্য কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ নির্বাহীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব পদে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে রপ্তানিমুখী ও শিল্প খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যায় পড়ছে। আবার পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ও নিয়মিত এমডি না থাকায় অনেক উদ্যোক্তাও বড় ধরনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় রয়েছেন।

ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকের পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেক ভালো। আমানত (ডিপোজিট) আবার ফিরতে শুরু করেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য (ক্যাশ লিকুইডিটি) সহায়তা নিতে হচ্ছে না।’

করপোরেট গ্রাহকদের এলসি ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে জটিলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব কথা ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে। বড় যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলোও আমরা সমাধান করছি। তবে অতিরিক্ত চাহিদা বা সুদ মওকুফের মতো সিদ্ধান্ত এখন নেওয়া সম্ভব নয়। যৌক্তিক যেসব আবেদন আসছে, সেগুলো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অযৌক্তিক কোনো দাবি পূরণ করা হবে না। আমার বোর্ডে অযৌক্তিক কিছু হবে না।’

ইসলামী ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকের তারল্য সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। পরিচালনা পর্ষদ পূর্ণাঙ্গ না থাকলেও নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব সিদ্ধান্ত এক সদস্যবিশিষ্ট বোর্ডই অনুমোদন দিচ্ছে। এ জন্য তাকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তিনি নিয়মিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় বাইরে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক। কারণ সাধারণভাবে বোর্ড বলতে একাধিক সদস্যকে বোঝানো হয়। ফলে একজন সদস্য দায়িত্ব পালন করায় কিছু গ্রাহক ও ব্যবসায়িক অংশীদার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়তে পারেন।’

ব্যাংকটির একটি শাখার প্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে তারল্য সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে, তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। ওই টাকা দিয়ে নতুন বিনিয়োগ বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেওয়া যায় না। ফলে ইচ্ছা করলেই এ অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত মেনেই এ অর্থ ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এগোতে হচ্ছে। একসঙ্গে কয়েকজনকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দিলে হাতে থাকা তারল্য দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। এরপর যদি কাউন্টারে হঠাৎ গ্রাহকদের চাপ বেড়ে যায়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা থাকলে একটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে করপোরেট গ্রাহকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সেবা প্রত্যাশা করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তারা বিকল্প ব্যাংকের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসার জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে এখনো নিয়মিত বোর্ড ও এমডি নিয়োগ হয়নি। ব্যাংকের স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং একজন নিয়মিত ও দক্ষ এমডি নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা আরো শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমও স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ বোর্ড ও নিয়মিত এমডি না থাকলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

নতুন পর্ষদ গঠন কতদূর

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত এলেই প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ ঘোষণা করা হবে।’

কেন সংকট

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে নামে-বেনামে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব অনিয়মের তথ্য প্রকাশের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করা হয়। এরপর নানা সংকটের মধ্যেও ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।

তবে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হলে তার অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল গ্রাহক আন্দোলন শুরু করেন। জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল আলোচনা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভ চলতে থাকে। এর প্রভাবে ব্যাংকটিতে আমানত উত্তোলনের চাপ বেড়ে যায় এবং তারল্য সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেয়। পরে পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন