ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব

‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা, এক দিনে নিহত শতাধিক

‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা, এক দিনে নিহত শতাধিক
ছবি: সংগৃহীত

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগের প্রথম দিন ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গুলিতে এক দিনে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। কয়েকশ গুলিবিদ্ধসহ আহত হন কয়েক হাজার মানুষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক হিসেবে ঘোষণা করা হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’। এদিন রাতেই নির্ধারিত হয়ে যায় কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার পরিণতি।

বিজ্ঞাপন

দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় দিনটির শুরুটা ছিল সাবলীল। একে একে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে প্রাণহানির খবর আসতে শুরু করলে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। দুপুর গড়াতেই রূপ নেয় গণবিস্ফোরণে।

শিক্ষার্থী থেকে দিনমজুর, পেশাজীবী থেকে সমাজকর্মী সবাই নেমে আসেন রাজপথে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা ছাত্র ও জনতার ওপর নৃশংস হামলা চালায়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, গণজাগরণ থামেনি।

এদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কারফিউ জারির পরও রাত ১০টা পর্যন্ত অনেক জায়গায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। ৫০টির বেশি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা এবং ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হন।

এছাড়া রাজধানী ঢাকায় ১১, সিরাজগঞ্জে ৯, লক্ষ্মীপুরে ৮, ফেনীতে ৭, নরসিংদীতে ৬, বগুড়া ও শেরপুরে ৫ জন করে, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, সিলেট ও মাগুরায় ৪ জন করে, মুন্সীগঞ্জ ও পাবনায় ৩ জন করে, জয়পুরহাটে ২, কুমিল্লায় এক পুলিশসহ তিনজন নিহত হন। চাঁদপুর, গাজীপুরের শ্রীপুর, বরিশাল, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ভোলা, ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও হবিগঞ্জে একজন করে মারা যান। আহত হন শত শত বিক্ষোভকারী।

এদিকে দিনভর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ হয়। ১৩টি স্থানে মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদের বাসভবনে হামলা হয়। কুষ্টিয়া, চাঁদপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, খুলনাসহ অন্তত ৩৯ জেলায় এসব ঘটনা ঘটে। পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। জেলা প্রশাসক কার্যালয়, থানা ও ইউএনও অফিসও ভাঙচুর করা হয়। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও বিএনপির কার্যালয়েও ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়। চাঁদপুর, বরিশাল, দিনাজপুরসহ ৩৮টির বেশি জেলায় এসব হামলার খবর পাওয়া যায়।

৪ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ধানমন্ডি-২৭, মিরপুর-১০, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরকারদলীয় সমর্থক ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।

শাহবাগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ভবনে আশ্রয় নেয়। এ সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অন্তত ২৪টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। মিরপুর-১০ হয়ে ওঠে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল।

সেখানে পুলিশ ও অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ কর্মীরা অবস্থান নেয়। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিনভর সংঘর্ষে শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, সায়েন্স ল্যাব, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা রক্তাক্ত হয়। আহত হয় ২২২ জন, ৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও খিলগাঁওয়ে গুলিবিদ্ধ কমপক্ষে ২২ জন চিকিৎসাধীন ছিল।

শাহবাগ মোড় ছিল বিক্ষোভকারীদের প্রধান কেন্দ্র। সেখানে গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়। বাংলামোটর ও আশপাশের পুলিশ বক্স এবং কাউন্সিলরের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সমন্বয়ে হামলা চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। উত্তরায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যাপক গুলির শব্দ শোনা যায়, রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে।

মিরপুরে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ হয়, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গুলি চালিয়ে পরে এলাকা ছেড়ে যায়। ধানমন্ডিতে একটি পোশাক ব্র্যান্ডের শোরুমে আগুন দেওয়া হয়। রামপুরা ও বাড্ডায় শিক্ষার্থী-সাধারণ মানুষ সকাল থেকে বিক্ষোভ চালান। পুরান ঢাকার রায়সাহেববাজার থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বাহিনীর একটি গাড়িতে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা।

একদিন এগিয়ে আনা হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’

৪ আগস্টের আগের দিন পর্যন্ত কর্মসূচি ছিল ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’। বাস্তবতা পাল্টে যায় দ্রুত। ৪ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফে ঘোষণা আসে– ৬ আগস্ট নয়, ৫ আগস্টেই হবে ‘মার্চ টু ঢাকা’। এই সিদ্ধান্তের কারণে ৪ আগস্ট রাতেই কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার পতনঘণ্টা বেজে যায়।

রাজধানীর শাহবাগে বেলা ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ গৃহযুদ্ধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাদের দলীয় ক্যাডারদের রাস্তায় নামিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক- বিজয় ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখনো সময় দিচ্ছি। সরকার যদি সহিংসতা চালিয়ে যেতে থাকে, আমরা জানিয়ে দিতে চাই, আমরা গণভবনের দিকে তাকিয়ে আছি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, যদি আমার ভাইদের বুকে গুলি করা হয়, যদি আমার বোনেরা আর আহত হয়, তাহলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। যেখানেই আঘাত আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থীদের শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

এরপর ‘দফা এক, দাবি এক– শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে কাঁপে রাজপথ। সেদিন সকালে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনকারীদের ঢল শুরু হলেও তা ছিল অবরোধ কিংবা মিছিলে সীমাবদ্ধ। তবে দুপুরের পর একযোগে মাঠে নামে আওয়ামী লীগপন্থি সংগঠনের সদস্যরা।

শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলো অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। দলীয় নীতিনির্ধারণী বৈঠকের পর দুই থেকে তিনদিন রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। দলের শীর্ষ নেতারা শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি ওঠার পর আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দেন।

আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর কবির নানক ধানমন্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘ধৈর্যের শেষ সীমায়’ পৌঁছেছে বলে ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ আখ্যায়িত করে সব সহিংসতার দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে রাজধানীতে আন্দোলনকারীদের কাঁধে ছিল প্রাণ হারানো মানুষের লাশ। ৪ আগস্ট বিকাল ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা লাশ কাঁধে তুলে নেয়।

জনতার স্রোতের মতো তারা এগিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পেরিয়ে শাহবাগের দিকে। স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ– ‘আমার ভাই মরল কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।’ সেই মিছিল যখন শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছে, পুলিশ দাবি করে, আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছে। মুহূর্তেই ছোড়া হয় টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষের মানব ঢল।

এমন পরিস্থিতিতে ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সরকার জারি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। সব সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় মোতায়েন করা হয় আধাসামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ঘোষণা আসে তিনদিনের সরকারি ছুটি। কিন্তু এসবও আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়, বরং আরো বেড়ে যায় মানুষের ক্ষোভ।

৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এতে শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া চালুর আহ্বান জানানো হয়। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে সেই সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।

চারদিকে আগুন, লাশ, কান্না আর বিক্ষোভের মধ্যেও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা শেখ হাসিনা গণভবনে অবস্থান করছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন