পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান আর্থিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশের অর্থনীতির আকার যতটা বেড়েছে, পুঁজিবাজারের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো এখনো ব্যাংকনির্ভর, যার কারণে আর্থিক ব্যবস্থায় এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। গত আড়াই বছরে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকে ছুটছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলে শিল্পায়নে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। দিন যত যাচ্ছে, শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের অবদান তত কমছে। দেশের শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের অতিনির্ভরতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, যেখানে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের চিত্রটি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের সামান্য অংশ মাত্র পুঁজিবাজার থেকে আসায় দেশের পুরো অর্থনৈতিক ঝুঁকি গিয়ে পড়ছে ব্যাংক খাতের ওপর। ভালো শেয়ারের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার কারণেই মূলত এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা নীতিমালায় কাঠামোগত পরিবর্তন এনে বড় প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণ এবং পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি উত্তোলন বাধ্যতামূলক করার জোর তাগিদ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির তথ্য সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের শিল্পায়নে ব্যাংক খাত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৩০২ কোট টাকা। আলোচ্য অর্থবছরে শিল্পায়নে অর্থায়নে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে মাত্র ০.৩১ শতাংশ। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৭৯ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ০.৭৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয়েছে ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে এসেছে ৬৪১ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ০.৬৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে এসেছে ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে পুঁজির সংস্থান হয়েছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের ০.৯৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি এবং ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, গত প্রায় আড়াই বছরে বাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হন না। আমাদের দেশে একটি আইপিও অনুমোদন হয়ে বাজারে আসতে সর্বনিম্ন ১৫ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অথচ ব্যাংকে আবেদন করলে মাত্র তিন সপ্তাহেই ঋণ পাওয়া সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগে। ফলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে আশা প্রকাশ করে বিএপিএলসি সভাপতি আরো বলেন, শেয়ারবাজারের নতুন কমিশন এ অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করছে। এখন যাতে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, সে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোচ্ছে। এছাড়া সিকিউরিটিজ নীতিমালায় কিছু বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বাধ্যবাধকতা ছিল, তাতে শিথিলতা আনা হচ্ছে। পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগও পুনরায় চালুর চিন্তাভাবনা চলছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক এবং এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুমিত পোদ্দার আমার দেশকে বলেন, অর্থায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ, বর্তমানে কত টাকার বেশি অর্থায়ন করতে হলে ব্যাংকের বাইরে পুঁজিবাজারে আসতে হবে—সে সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশে যত সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়, সেটি বিশ্বের আর কোথাও নেই। তাই পুঁজিবাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি শুধু কথায় নয়, কাজেও দেখাতে হবে। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি কোনো নতুন ব্যবসায়িক প্রকল্প বা শিল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন, তবে সেখানে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনুপাত বেঁধে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, মোট অর্থায়নের ৬০ শতাংশ ব্যাংক এবং ৪০ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে নেওয়ার নিয়ম করা যেতে পারে। কারণ, বর্তমান তারল্য সংকটের কারণে কেবল ব্যাংকের পক্ষে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বড় কোনো প্রকল্প কিংবা বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারে আসতেই হবে। তাই নির্ধারিত অঙ্কের পর পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের বিষয়টিকে আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর আর কোনো বিকল্প নেই।
জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের অর্থায়নে প্রধান ভূমিকা রাখে পুঁজিবাজার। করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে সেসব দেশে মেগা প্রকল্পগুলোর মূলধন সংগৃহীত হয়। ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের মূলধনের অনুপাত ৮০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ বাংলাদেশে এই অনুপাত ১০ শতাংশেরও নিচে। দীর্ঘমেয়াদি মেগা ঋণের পুরো বোঝা ব্যাংক খাতের ওপর চাপানোর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট জটিল রূপ ধারণ করছে।
জানা গেছে, শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ারের চরম ঘাটতি ও একমুখী ইকুইটি নির্ভরতায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অতিমাত্রায় ইকুইটিনির্ভর। নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বন্ড মার্কেট বা মিউচুয়াল ফান্ড খাত শক্তিশালী হতে পারেনি। এছাড়া বাজারে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী (ফান্ডামেন্টাল) শেয়ারের চরম ঘাটতি রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যেসব আইপিও এসেছে, তার অনেকগুলোই মানহীন হওয়ায় কিছুদিন পর লোকসানি বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়েছে। ভালো বহুজাতিক ও দেশি বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর নীতিগত কর-প্রণোদনা না থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আমার দেশকে বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ইতোমধ্যে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোও দূর করার কাজ চলছে। এ ছাড়া কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিও কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। বন্ড বাজারকে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি করপোরেট বন্ডের প্রবাহ বাড়াতে কমিশন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


