ধরুন, আপনি একজন বাড়িওয়ালা এবং আপনার বাড়ি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। যখন ওই প্রতিষ্ঠান আপনাকে বাড়ির ভাড়া পরিশোধ করবে, তখন আয়কর আইন অনুযায়ী তারা ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য ট্যাক্স কেটে রাখবে। কর্তিত ট্যাক্সের টাকা প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কোষাগারে জমা দেবে।
বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী, বাড়ি ভাড়ার উপর ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর রয়েছে। এখন যদি প্রতিষ্ঠানটির কাছে মাসিক ভাড়ার পরিমাণ এক লাখ টাকা হয়; তাহলে আপনি বাড়িওয়ালা হিসেবে মাসে ৯৫ হাজার টাকা পাবেন এবং প্রতিষ্ঠানটি বাকি পাঁচ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেবে।
কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি ওই উৎসে কর কেটে রাখছে কিনা, কিংবা কেটে রাখলেও সেটি সরকারের কোষাগারে জমা পড়ছে কি না; তার সঠিক তদারকির ব্যবস্থা নেই। ফলে উৎসে করের নজরদারিতে উইথহোল্ড ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন (উইন) নামে নতুন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ১১ জুন সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়টি প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
এনবিআর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে এবং কর ফাঁকির প্রবণতাও কমে আসবে। একই সঙ্গে কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণে উৎসে কর কেটে রাখছে কিংবা সঠিকভাবে কেটে রাখছে কিনা; তার তথ্য যেমন জানা যাবে, তেমনি কার কাছ থেকে কী পরিমাণ কর কেটে রাখা হয়েছে সেটিও সঠিকভাবে জানা যাবে। বর্তমানে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। উইথহোল্ড আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার চালু হলে উৎসে কর সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, উৎস থেকে কাটা করের বিপরীতে যে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে, তা বার্ষিক ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় কর সমন্বয় বা রিফান্ড পেতে সাহায্য করবে। অপরদিকে কর কর্তনকারী কর্তৃপক্ষ প্রমাণ দিতে পারবে যে, তারা সরকারি নিয়ম মেনে কর কেটে সঠিক খাতে জমা দিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে অডিট বা জরিমানার হাত থেকে রক্ষা করবে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন কিংবা নিয়োগকৃত কর্মীদের বেতন কিংবা অন্য কোনো পণ্য বা সেবার উপর উৎসে কর বা অগ্রিম আয়কর কাটার নিয়ম রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের জন্য নিবন্ধন নিতে হবে। গ্রাহকের আমানতের ওপর অর্জিত সুদের ওপর ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর কেটে রাখে। এ জন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও এ ধরনের আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের প্রয়োজন হবে। করের ভিত্তি সম্প্রসারণে আগামী বাজেটে বেশকিছু উদ্যোগ থাকছে। সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে উইন চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে এনবিআর।
কালো টাকা সাদার সুযোগ থাকছে না
আগামী অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের উচ্চ মহল থেকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের এ সুযোগ রাখার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বড় ধরনের সমালোচনার মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে অবশেষে সরে আসছে এনবিআর। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কালো টাকা নিয়ে আমাদের আগের অবস্থানই বজায় থাকবে। এ নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না। এখানে উল্লেখ্য, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কালো টাকা সাদা করার সব ধরনের বিধান বিলোপ করা হয়।
চালু হচ্ছে না সম্পদকর
দুই যুগের বেশি সময় পর ফের সম্পদকর চালুর বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ খাত থেকে বড় ধরনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান প্রাক বাজেট আলোচনায় বেশ কয়েক দফা সম্পদকর চালুর ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় আগামী বাজেটে এ ধরনের কর চালুর বিষয়ে পিছু হাঁটছে এনবিআর। তবে আরো যাচাই-বাছাই করে আগামীতে এটি চালু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্পদকর চালু হলে সম্পদ থাকলে এমনকি সে সম্পদ থেকে আয় না হলেও তার জন্য কর দিতে হবে। ১৯৯৯ সালে সম্পদকরের বিধান বাতিল করে সারচার্জ আরোপ করা হয়।
৬৭ জনকে দেওয়া হবে সেরা করদাতার পুরস্কার
আগামী অর্থবছরে করদাতাদের উৎসাহী করতে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ২২টিসহ মোট ৬৭ জন করদাতাকে দেওয়া হবে সেরা করদাতার পুরস্কার। এ জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সেরা করদাতাদের জন্য বেশকিছু সুযোগ-সুবিধার বিষয়ও প্রস্তাব থাকবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে—জাতীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সার্কিট হাউসে অগ্রাধিকার, সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধা, বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ ইত্যাদি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



নিজের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াইয়ের ঘোষণা স্টারমারের