মাদক মামলায় সাজা কম, খালাস বেশি

মাদক মামলায় সাজা কম, খালাস বেশি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

দেশে মাদক মামলায় আসামিদের সাজার চেয়ে খালাসের হার বেশি। তদন্তের দুর্বলতা, আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং রাসায়নিক প্রতিবেদনের অসংগতিসহ নানা আইনি ফাঁক গলিয়ে চিহ্নিত আসামিদের বড় অংশই পার পেয়ে যাচ্ছে।

মাদকবিরোধী অভিযানে দেশে প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ ধরা পড়ছে। কখনো ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ হাতেনাতে, আবার কখনো ট্রাকভর্তি বড় চালানসহ আটক করা হচ্ছে মাদক কারবারিদের। থানায় মামলা হচ্ছে, আসামিকে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। কিন্তু তাদের কতজন আদালতে সাজা পাচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সবশেষ হিসাব বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সংস্থাটি একাই এক লাখ ৬৩ হাজার ৭৩১টি মামলা করেছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার ৪২৫ জনকে। অথচ গত জুন পর্যন্ত সাজা হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ৪৩৮ জনের। একই সময়ে মোবাইল কোর্টে আলাদাভাবে মামলা হয়েছে আরো এক লাখ ৩,৮৬৮টি। পৌনে দুই লাখের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও সাজা পাওয়ার চেয়ে খালাসের হার বেশি। এর মূল কারণ তদন্তের দুর্বলতা, আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও রাসায়নিক প্রতিবেদনের অসংগতি। এছাড়া আইনি নানা ফাঁক কাজে লাগিয়ে চিহ্নিত আসামিদের বড় অংশই পার পেয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সমীক্ষার তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ডিএনসি সূত্র বলছে, ঢাকাসহ দেশের ২৬ জেলার আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া ৫০০ মাদক মামলার রায় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০৪ মামলায় সাজা এবং ২৯৬ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছে। অর্থাৎ সাজার হার ৪১ শতাংশ, খালাস ৫৯ শতাংশ। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেওয়া রায় পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মাদক নিয়ে শুধু ডিএনসি একাই কাজ করে না। পাশাপাশি পুলিশ ও বিভিন্ন ইউনিট, যেমন র‌্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ডও নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এসব বাহিনীর অভিযানে প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার এবং মাদক কারবারে জড়িতরা গ্রেপ্তারও হয়েছে।

একের পর এক রেকর্ড জব্দ

সম্প্রতি জব্দ করা বড় চালানগুলো থেকেই মাদক বিস্তারের ভয়াবহতা আঁচ করা যায়। গত ১১ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ ও রামুতে পৃথক অভিযানে এক দিনে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। হ্নীলার নাফ নদীসংলগ্ন স্থান থেকে আট লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ এবং রামুর তুলাবাগান থেকে

আরো দুই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। গত ৮ এপ্রিল টেকনাফ থেকে ঢাকাগামী মাছবাহী পিকআপে তল্লাশি চালিয়ে এক লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাছের ড্রামে লুকিয়ে নেওয়া হচ্ছিল এসব ইয়াবা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চালানটি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিল বলে বিজিবি জানায়।

এরপর ২৩ জুলাই নাফ নদী দিয়ে মিয়ানমার থেকে নৌকায় বড় চালান ঢোকার সময় এক লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। ওই সময় গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে। গত ১৭ আগস্ট কুমিল্লার জাগুরজুলি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টয়োটা প্রাডো থামিয়ে তিন লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। চালানটির মূল্য ১৫ কোটি টাকা। গাড়িটি কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। এর আগে জুনে এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবাভর্তি একটি গাড়ি জব্দ হয়। ২০২৫ সালের মার্চে হাতিরঝিল থেকে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। একই বছর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নারী বাহকসহ চারজনকে ৪০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের তথ্যও রয়েছে। এসব চালানের অর্থদাতা, সংগ্রহকারী, মজুতদার ও চূড়ান্ত ক্রেতা নেটওয়ার্কের কতজন মামলায় এসেছেÑসে প্রশ্নই বড়।

ধরা পড়ে বাহক, আড়ালে হোতা

বড় মাদকচক্র নির্মূলে অন্যতম দুর্বলতা হলো চালান বহনকারীকে গ্রেপ্তার করেই তদন্ত অনেক সময় থেমে যায়। অথচ ১০ লাখের বেশি, তিন লাখ কিংবা এক লাখ ৭২ হাজার ইয়াবার চালান কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির পক্ষে সংগ্রহ ও পরিবহন করা কঠিন। এর পেছনে অর্থ, যোগাযোগ, পরিবহন, মজুত ও বিতরণের নেটওয়ার্ক থাকার কথা। ৫০০ মামলার রায় বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বাইরে অর্থের জোগানদাতা, পৃষ্ঠপোষক বা বড় কারবারিদের বিষয়ে অভিযোগপত্রে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে চালানটি কে পাঠিয়েছে, টাকা কে দিয়েছে, কোথায় মজুত হওয়ার কথা ছিল কিংবা কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিলÑ সেসব প্রশ্নে অনেক সময় তদন্ত এগোয় না।

চাঞ্চল্যকর মামলায় খালাস, দীর্ঘসূত্রতা

মাদকের বড় চালান জব্দ এবং কারবারে জড়িত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও ওই সব মামলা বিচারে গিয়ে দুর্বল হওয়ার নজিরও আছে। ২০২১ সালের আগস্টে বারিধারার বাসা থেকে ইয়াবা, মদ ও বিয়ারসহ গ্রেপ্তার হন মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর মামলা চলার পর ২০২৫ সালের মার্চে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে টেকনাফে শতাধিক আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি অস্ত্র ও মাদকসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। প্রায় তিন বছর পর আদালত তাদের দেড় বছরের কারাদণ্ড এবং অস্ত্র মামলা থেকে খালাস দেয়।

চট্টগ্রামে ২০১৬ সালের একটি মাদক মামলায় রমজান আলীর বিচারিক সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে মামলা ঝুলে ছিল প্রায় ১০ বছর। চলতি বছরের ৫ জুন আলামত ও প্রমাণের অভাবে তাকে খালাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কক্সবাজারের ‘ইয়াবা গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ২০২৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হন। তার মামলার বিচার এখনো চলমান।

খালাস পাওয়ার নেপথ্যে

বিশ্লেষণে মাদক মামলা থেকে আসামিদের খালাসের পেছনে নানা ত্রুটি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑএজাহার ও জব্দ তালিকায় আলামত উদ্ধারের সময়, স্থান ও পরিমাণে অমিল; দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত; নিরপেক্ষ সাক্ষীর অনুপস্থিতি; জব্দ তালিকায় গরমিল; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য; রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে অসংগতি। এছাড়া বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়া, আসামির ঠিকানা যাচাই না করা, এক থানার ঘটনায় অন্য থানায় মামলা, জব্দ আলামত আদালতে উপস্থাপন না করা, কোনো সাক্ষী না পাওয়া, উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য না দেওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদারকির অভাব এবং রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতিও রয়েছে। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অভিযানের সময় ভিডিও ও ডিজিটাল আলামত বাধ্যতামূলক না করা। কারণ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে (সংশোধিত) ডিজিটাল আলামতও আদালতে ডকুমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সীমান্ত থেকে মহানগরÑমাদকের বাজার

মাদকাসক্তের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশে প্রায় ৮২ লাখ মাদকাসক্ত এবং বছরে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় হয় বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। ডিএনসির সহায়তায় পরিচালিত বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির গবেষণায় বলা হয়, দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮২ লাখের বেশি এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ এর সঙ্গে যুক্ত।

আইন মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজাযোগ্য গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩টি। এর মধ্যে আট মহানগরে রয়েছে ৪৭ হাজার ৯৪৮টি। শুধু ঢাকা মহানগরে ২১ হাজার ৯২০ এবং চট্টগ্রাম মহানগরে ১৫ হাজার ৪৪টি।

আইনে কঠোর সাজা, বাস্তবে দীর্ঘ বিচার

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬ ধারায় মাদকের ধরন ও পরিমাণভেদে কঠোর সাজা রয়েছে। হেরোইন ও কোকেনের ক্ষেত্রে ২৫ গ্রামের বেশি এবং ইয়াবা বা অ্যামফিটামিনের ক্ষেত্রে ৪০০ গ্রামের বেশি হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রয়েছে। পরিমাণভেদে এক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও আছে। আইনে গুরুতর মাদক মামলার বিচার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার বিধান থাকলেও বাস্তবে মামলা শেষ হতে ১০ বছর পর্যন্ত লাগছে।

২০১৯ সালে যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ থেকে ১১৮ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় গত ১৩ এপ্রিল ঢাকার আদালত দুজনকে যাবজ্জীবন এবং একজনকে খালাস দেয়। এ মামলায় পাঁচজন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রমাণের কাঠামো শক্ত হলে পুরোনো মামলায়ও সাজা সম্ভব, আবার ঘাটতি থাকলে খালাসও হতে পারে।

মামলাজট কমাতে ২২ ট্রাইব্যুনাল গঠন

মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে সরকার গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজাযোগ্য গুরুতর মাদক মামলার দ্রুত বিচারই এর লক্ষ্য। ঢাকায় জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি মহানগরের জন্য চারটি, চট্টগ্রাম মহানগরে তিনটি এবং কক্সবাজারে তিনটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।

বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, শুধু ট্রাইব্যুনাল বা বিচারক বাড়ালেই খালাস কমবে না। অভিযানের সময় ডিজিটাল আলামত ও ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ, নিরপেক্ষ সাক্ষী নিশ্চিত করা, বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে যথাযথ ভারসাম্য, রাসায়নিক পরীক্ষার নির্ভুলতা এবং তদন্তকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো তদন্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা। কারণ, দীর্ঘ সময় পর যখন আসামি খালাস পেয়ে যায়, তখন তদন্তের গভীরতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। আসামি খালাস পেলেও তদন্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হয় না। কারণ, মাদক উদ্ধারের বিষয়টিকে সাধারণত গুরুত্ব দেওয়া হয়। তদন্তের ক্ষেত্রে সেই গুরত্বটা খুব বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। তাছাড়া মাদকসহ একজন বাহককে গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ না করে চালানটি কে পাঠিয়েছে, কে অর্থ দিয়েছে, কোথায় মজুত হয়েছে এবং কার মাধ্যমে বাজারে ছড়ানোর কথা ছিলÑপুরো নেটওয়ার্ককে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন