রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমেছে ৫৫ শতাংশ

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমেছে ৫৫ শতাংশ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে সবখানে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় বাংলাদেশের বিলাসি পণ্য হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিগত রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। প্রতি মাসে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গড়ে এক হাজার ২০০ রিকন্ডিশন্ড গাড়ি খালাস হলেও ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। মার্চ ও এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি খালাসের পরিমাণ অর্ধেকে নেমেছে। গত বছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম চার মাসে গাড়ি আমদানি কমেছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ। আর যুদ্ধের পরের দুই মাস হিসাব করলে তা ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আমদানি কমে যাওয়ায় বন্দরের কারশেড এখন অনেকটা ফাঁকা পড়ে আছে।

বন্দর সূত্র জানায়, পুরো ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৩১টি জাহাজে করে আমদানি করা হয়েছিল ১৪ হাজার ১৬৪ ইউনিট রিকন্ডিশন গাড়ি। এর মধ্যে একক মাস হিসেবে ওই বছরের মার্চে সবচেয়ে বেশি গাড়ি আমদানি হয়েছে। সংখ্যায় যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯৫৯টি গাড়ি, যা স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি।

বিজ্ঞাপন

গত চার অর্থ-বছরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ১২০০ ইউনিট গাড়ি আমদানি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিন্তু চলতি বছরের গত দুই মাসে গাড়ি আমদানি কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গাড়ি আমদানি ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ছন্দপতন ঘটেছে আমদানিতে।

পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলে গাড়ি আমদানি কমেছে ৫৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গত বছরের মার্চ ও এপ্রিলে আমদানি করা গাড়ির সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৮১৭টি। কিন্তু এই বছরের মার্চে গাড়ি এসেছে ৪৯৭ ইউনিট আর এপ্রিলে এসেছে মাত্র ৭৪৪ ইউনিট। আর ক্যালেন্ডার ইয়ার হিসাব করলে ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে আমদানি করা গাড়ির সংখ্যা ছিল চার হাজার ৭২৭টি। এ বছর ওই সময়ে গাড়ি আমদানি হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৯১২টি।

রিকন্ডিশন গাড়ি ব্যবসায়ীরা জানান, মার্চ-মে পর্যন্ত সময়কে গাড়ি ব্যবসার মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কারণ প্রতি বছর বাজেটে গাড়ির দাম বাড়ানো হয়। এই কারণে ক্রেতারাও মে মাসের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দামে গাড়ি কিনতে চায়। আবার বিক্রেতারাও বেশি গাড়ি আমদানির সুবিধার্থে কম লাভে গাড়ি বিক্রি করে দেন। এই কারণে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গাড়ি আমদানি হয় বেশি। বছরের অন্যান্য সময়ে মাসে গড়ে এক হাজারের কাছাকাছি গাড়ি আমদানি হয়। কিন্তু এই তিন মাস গাড়ি আমদানি করা গাড়ির সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এবার এই সময় গাড়ির আমদানি ও বিক্রি সবচেয়ে কম।

রিকন্ডিশন গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়া গাড়ি ব্যবসায় ধস নামার অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটি কারণ। এই দুই ইস্যু প্রধান ইস্যু নয়। মূলত মানুষের হাতে টাকা নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বলা হয়েছিল নির্বাচনের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী তিন মাসে সেই লক্ষণ দৃশ্যমান হয়নি। আর এই কারণেই বাজারে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে। বিক্রি কমার কারণেই আমদানি কমেছে।

তার মতে, দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সরকারি প্রজেক্টে গাড়ি কেনা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি করপোরেট অফিসগুলোতে গাড়ি কেনা বাবদ যে ঋণ ব্যবস্থা চালু ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা বন্ধ। রপ্তানিমুখী শিল্পখাতেও নেমেছে স্থবিরতা। তাই ব্যবসা-বাণিজ্য সচল না হলে গাড়ির ব্যবসা ও আমদানি বাড়বে না।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে একটি গাড়ি আমদানি করতে হলে ৮০০ থেকে ২০০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া জাপান থেকে পাঁচ বছরের বেশি বয়সের গাড়ি আমদানি করা যায় না। আমদানি শুল্ক কমানোর পাশাপাশি আমদানি গাড়ির বয়সসীমা ৫-৭ কিংবা ৮ বছর করা গেলে বাজারে গাড়ির দাম কমবে। আর দাম কমলে বিক্রি বাড়বে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, কাস্টমসের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত রিকন্ডিশন গাড়ি। বছরে এই খাত থেকে গড়ে দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। হঠাৎ করে গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ও কমে গেছে। গত বছরের প্রথম চার মাসে শুধু রিকন্ডিশন গাড়ির খাত থেকে রাজস্ব এসেছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এ বছর এই খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৪৫ কোটি টাকা।

গাড়ি ব্যবসার এই মন্দাভাব আরো দৃশ্যমান হয় চট্টগ্রাম বন্দরের কারশেডে। নতুন কার শেডে ৬০০টি গাড়ি রাখার ধারণক্ষমতা আছে। স্বাভাবিক সময়ে ৭০০-৮০০ গাড়ি রাখা হয় এই সেডে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গাড়ি আছে মাত্র ২১৮টি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, আমদানি ও ডেলিভারি সমান গতিতে হয়। কিন্তু গত দুই মাস ধরে গাড়ি আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। আগে অনেক ব্যবসায়ী নিয়মিত গাড়ি আমদানি করত। এক চালানের কয়েকটি গাড়ি বন্দরে রেখেই নতুন চালান আনত। আর এই কারণে শেডে গাড়ি বেশি থাকত। কিন্তু এখন আমদানির সেই গতি নেই। আর এই কারণেই বন্দরের কার শেড এখন ফাঁকা পড়ে আছে।

তিনি আরো জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে তিনটি কার শেড মিলিয়ে এক হাজার ২৫০ ইউনিট গাড়ি ধারণক্ষমতা আছে। সেখানে বর্তমানে ৬১৪টি গাড়ির অবস্থান আছে। এর মধ্যে নিলামযোগ্য গাড়ির সংখ্যা ৪১৩টি। যেগুলো অনেক আগে আমদানি করা হয়েছে। বিভিন্ন জটিলতায় আমদানিকারকরা খালাস করতে পারেনি। আইনি জটিলতায় কাস্টমসও নিলাম করেনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন