চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে ধারাবাহিক ধস চলছেই। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত গত ১১ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে তিন হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তিন হাজার ৬৫৬ কোটি ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। তবে এ খাতের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে কমেছে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, টানা কয়েক মাসের দুর্বলতার পর এপ্রিল মাসে ঘুরে দাঁড়ানোর যে আভাস দেখা গিয়েছিল, এক মাস পরই তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইউরোপের মতো প্রধান বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৫৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের মে মাসের ৩৯২ কোটি ডলারের তুলনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কম। মূলত পোশাক খাতের এ বড় পতনের কারণেই সামগ্রিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ইপিবির দেশভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ইইউতে এক হাজার ৭৩৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে আগের অর্থবছরে একই সময়ে আয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮২৫ কোটি ডলার। সুতরাং এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে চার দশমিক ৮৮ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে উল্লিখিত সময়ে ৭০৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় মাত্র শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ কমলেও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এ শিল্পের জন্য সতর্কসংকেত।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ অঞ্চলগুলোতে পিছিয়ে পড়ছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ইইউ থেকে, তাই এ বাজারে এমন পতন দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। রপ্তানি আদেশে ব্যাপকভাবে ভাটা পড়েছে। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চীন ও ভারতের আগ্রাসী রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক বেশি শুল্কের কারণে তারা কম দামে ইইউতে রপ্তানি করছে। এ কারণে সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, পুরো ইইউ বাজারেই পোশাক আমদানিতে মন্দা চলছে। নীতিবাচক প্রভাব শুধু বাংলাদেশের উপরেই নয়, বরং অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর অবস্থাও একই। সামগ্রিকভাবে ইইউ বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে।
তিনি বলেন, চাহিদা কমে যাওয়ায় ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তারা এখন আগের তুলনায় বেশি দরকষাকষি করছেন এবং কমদামে পণ্য কিনতে চাইছেন, যা বাংলাদেশসহ সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর মূল্যছাড়ের চাপ বাড়াচ্ছে। এখন মূল্যছাড়ের চ্যালেঞ্জ যারা বেশি নিতে পারবে, তাদের জন্য ইইউ বাজার সহজ হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, অন্যথায় পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাতে আরো চাপ তৈরি হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ