ঝলমলে আলো। সাজানো শোরুম। কাচঘেরা দোকানে সারি সারি পণ্য। কোথাও ক্রেতার অপেক্ষায় বিক্রয়কর্মী, কোথাও আবার দিনের পর দিন একই পণ্য তাকে পড়ে আছে। এক সময় যে মার্কেটগুলোতে সন্ধ্যার পর পা ফেলার জায়গা পাওয়া যেত না, সেসব মার্কেটের অনেক দোকানেই এখন বিক্রি ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রেতা আসছেন, প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন; কিন্তু আগের মতো পরিমাণে নয়। বিক্রি হলেও ব্যবসায়ীর হাতে থাকছে না কাঙ্ক্ষিত মুনাফা।
মূলধনের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনলাইন বেচাকেনার বাড়তি প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশের খুচরো ব্যবসা এখন কঠিন সময় পার করছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। দোকানে পণ্য আছে; কিন্তু নতুন করে পণ্য তোলার মতো পর্যাপ্ত মূলধন নেই। বিক্রি আছে, কিন্তু লাভ কম।
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বলেন, দেশে ব্যবসা এখন খুব খারাপ। পুরোপুরি স্থবির না হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়, জটিল কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসার খরচ ও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
তার মতে, বিক্রি কমে যাওয়া ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়; বরং বিক্রির বিপরীতে লভ্যাংশ কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবই এখন বড় সংকট।
চার লাখ মার্কেট, তবু স্বস্তি নেই
ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সমুদ্রবন্দরের কারণে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকেই চট্টগ্রাম ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। পরবর্তী সময়ে পুরান ঢাকার বাংলাবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে ঢাকা নিউ মার্কেটের মাধ্যমে আধুনিক বিপণিবিতানের যাত্রা শুরু হয়। এরপর বায়তুল মোকাররম, গাউছিয়া, ইস্টার্ন প্লাজা হয়ে দেশে শপিংমল সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। ২০০৪ সালে বসুন্ধরা সিটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে আধুনিক ‘মেগা মল’ সংস্কৃতি আরো জনপ্রিয় হয়।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট, শপিংমল ও বিভিন্ন বিপণিবিতানের সংখ্যা আনুমানিক চার লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ছয় হাজারের বেশি মার্কেট। এসব মার্কেট ঘিরে বছরে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে দেশি পণ্যের বাণিজ্যের আকার প্রায় আট লাখ কোটি টাকা।
এত বড় বাজারে মন্দার প্রভাব শুধু দোকানিদের ওপর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মচারী, সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার, আমদানিকারক ও উৎপাদকদের জীবিকা।
মূল্যস্ফীতিতে বদলে গেছে ক্রেতার ঝুড়ি
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। দাম বাড়লেও আয় একই গতিতে না বাড়ায় ক্রেতারা এখন কেনাকাটায় বেশি হিসাবি। প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা হলেও বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা কমেছে ব্যাপক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতা বাজার থেকে পুরোপুরি সরে যাননি; বরং বদলে গেছে তার কেনাকাটার ধরন। দাম যাচাই করা, ছাড়ের অপেক্ষা করা, কমদামি বিকল্প নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সাধারণ প্রবণতা।
উচ্চমানের ও আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে এ চাপ আরো স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জীবনযাপন, ফ্যাশন ও আমদানিনির্ভর পণ্যের বিক্রি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক দোকানে অবিক্রীত পণ্যের মজুতও বাড়ছে।
বিক্রির চেয়েও বড় সমস্যা মুনাফা কমে যাওয়া
খুচরো ব্যবসায় শুধু বিক্রি থাকলেই হয় না, বিক্রির পর পর্যাপ্ত মুনাফাও থাকতে হয়। সেই মুনাফা থেকেই দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন, কর-ভ্যাট এবং ব্যাংকঋণের সুদ মেটাতে হয়। কিন্তু পণ্যের ক্রয়মূল্য বাড়লেও সব সময় সেই বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপানো যাচ্ছে না। কারণ, ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা সীমিত। ফলে কম দামে বিক্রি করলে মুনাফা কমছে, আবার দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্টকের ঝুঁকি। বেশি পণ্য তুললে মূলধন আটকে যাচ্ছে, কম পণ্য তুললে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। কোনো পণ্য দ্রুত বিক্রি না হলে ব্যবসায়ীর নগদ অর্থের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবেই বাড়ছে কার্যকরী মূলধনের সংকট।
উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ
ব্যবসায়ীদের অন্যতম দাবি সহজ শর্তে স্বল্পসুদের ঋণ। কারণ, ঋণের সুদ বেশি হলে মুনাফার বড় অংশই চলে যায় ঋণের খরচ মেটাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আট দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছিল। তবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা কমে যায় ৫.৩১ শতাংশ। সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে মোট ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই ঋণের স্থিতি ছিল ১৭.০২ শতাংশ।
২০২৬ সালে সিএমএসএমই খাতে কার্যকরী মূলধন বাড়াতে ‘সিএমএসএমই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিফাইন্যান্স ফান্ড’ চালুর উদ্যোগও নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই অর্থ প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে কতটা সহজে পৌঁছাবে-সে প্রশ্ন ব্যবসায়ীদের।
তাদের অভিযোগ, জামানত, কাগজপত্র, ঋণ অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যাংকের কঠোর শর্তের কারণে অনেক ছোট ব্যবসায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
কর-ভ্যাট ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার জটিলতাও ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মুনাফা কমে গেলেও টার্নওভারের ওপর নির্ভরশীল করের চাপ ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের মার্চে আধুনিক খুচরো ব্যবসার মালিকরা মোট বিক্রির ওপর আরোপিত ন্যূনতম কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.২৫ শতাংশ করার দাবি জানান। তাদের যুক্তি হলো, লাভ না হলেও বিক্রির ওপর কর দিতে হলে কম মুনাফার ব্যবসায় তা বড় চাপ তৈরি করে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পরিবহন, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়ায় ব্যবসায়ীর হাতে থাকা মুনাফা আরো কমে যাচ্ছে।
অনলাইন বাজারের নিঃশব্দ চাপ
ঐতিহ্যবাহী মার্কেটের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ অনলাইন বেচাকেনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও হোম ডেলিভারি মানুষের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে দিয়েছে। এখন দোকানে না গিয়েই মোবাইল ফোনে পণ্যের দামে তুলনা, রিভিউ দেখা এবং অর্ডার দেওয়া সম্ভব।
তবে অনলাইন খাতও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। তীব্র প্রতিযোগিতা, কম মুনাফা ও অর্থায়ন সংকটে অনলাইন গ্রোসারি ব্যবসার অনেক প্রতিষ্ঠানও টেকসই মুনাফা করতে পারছে না। অর্থাৎ, সংকটটি শুধু অফলাইন ব্যবসার নয়; পুরো খুচরো বাজারই এখন কম মুনাফা ও বাড়তি প্রতিযোগিতার বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ
আরিফুর রহমান টিপুর মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিপুল পরিমাণ পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করতে হওয়ায় ডলার, আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। তিনি কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পোশাকসহ স্থানীয় শিল্পে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশি পণ্যের মান, প্যাকেজিং, সরবরাহ ও ব্র্যান্ডিং উন্নত করার ওপর জোর দেন।
তার মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে। কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দুর্নীতি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খরচ কমিয়ে লাইসেন্স এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করে সরবরাহ ব্যয় কমাতে হবে।
সামনে টিকে থাকার লড়াই
দেশের বিপণিবিতান ও খুচরো ব্যবসার বর্তমান সংকট কেবল বিক্রি কমে যাওয়ার গল্প নয়; এটি মূলধন, ক্রয়ক্ষমতা, মুনাফা ও পরিচালন ব্যয়—সবকিছুর সম্মিলিত সংকট। বাজারে ক্রেতা আছে, প্রয়োজনও আছে। কিন্তু ক্রেতার পকেটের অবস্থা আগের মতো নেই; ব্যবসায়ীর পুঁজিও সীমিত। ফলে পণ্য বিক্রি করাই এখন শেষ কথা নয়; বিক্রি করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও বড় প্রশ্ন।
মার্কেটের ঝলমলে আলো তাই এখন আর শুধু সমৃদ্ধির প্রতীক নয়। সেই আলোর নিচে অনেক দোকানেই চলছে টিকে থাকার হিসাব—কত টাকা বিক্রি হলো, কত টাকা আটকে আছে, কত টাকা ঋণ শোধ করতে হবে এবং মাস শেষে আদৌ কতটা লাভ থাকবে। এই হিসাবের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের খুচরো ব্যবসার আগামী দিনের চেহারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


