২০ বছরেও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি জিনজিরা হাসপাতালে

২০ বছরেও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি জিনজিরা হাসপাতালে
আমার দেশ গ্রাফিক্স

ভবন আছে, শয্যা আছে, চিকিৎসকের পদও আছে— নেই শুধু পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা। উদ্বোধনের দুই দশক পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও নানা অনিয়মের কারণে কার্যত খুঁড়িয়ে চলছে জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতাল।

পাঁচ চিকিৎসকের বিপরীতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। ১৮ পদের বিপরীতে ২৮ জনের জনবল থাকার কথা থাকলেও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে সাত থেকে ১০ জনকে। বহির্বিভাগে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, দুপুর ১২টার পর চিকিৎসক ও কর্মীদের অনেকেই আর হাসপাতালে থাকেন না।

বিজ্ঞাপন

শুধু জনবল সংকটই নয়, হাসপাতালের কোয়ার্টার ও ডরমিটরি ব্যবহারে অনিয়ম, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফ্লোর তালাবদ্ধ থাকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে। ফলে চুলকানি, জ্বর-সর্দি, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ মাপার মতো প্রাথমিক সেবার বাইরে এখানে কার্যত বড় কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম নেই বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

জিনজিরা এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান হাসপাতালটি স্থাপনের উদ্যোগ নেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৬ সালের ৭ জুলাই হাসপাতালটির উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণে ব্যয় হয় তিন কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

তবে নির্মাণের পরই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। একই বছর র‍্যাব-১০ সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে। প্রায় আট বছর পর ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর র‍্যাব-১০ ক্যাম্প সরিয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় নিয়ে গেলে হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন হাসপাতাল ভবন অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলেই ভবনটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হতো।

২০২০ সালের ১১ মার্চ করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটি প্রস্তুত করা হয়। তখন ৯টি কেবিনসহ ২৯টি বেডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা করা হয়। করোনা পরিস্থিতি শেষ হলে শুধু বহির্বিভাগের কার্যক্রম চালু রেখে অন্য সেবাগুলো আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

সম্প্রতি হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা যায়, পঞ্চম তলার পশ্চিম পাশের পাঁচটি ডরমিটরি কক্ষ দখল করে এসি লাগিয়ে বসবাস করছেন হাসপাতালের নার্স সাবরিনা আক্তার রুবি। পূর্বপাশের অংশ বন্ধ। চতুর্থ তলাও পুরোপুরি তালাবদ্ধ। বিভিন্ন স্থানে করোনাকালে ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে রয়েছে।

তৃতীয় তলার লেবার রুমে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত সোহেল হাসান ও মিশকাত জাহান দম্পতিকে অফিস করতে দেখা যায়। একই তলায় একাধিক মেডিকেল অফিসারের কক্ষ থাকলেও ডিউটি করেন মাত্র একজন। দুই চিকিৎসক ডিউটি ভাগাভাগি করে একদিন পর একদিন দায়িত্ব পালন করেন। বাকি তিনজন অন্যত্র সংযুক্ত রয়েছেন। ফলে দিনে একজনের বেশি চিকিৎসকের দেখা মেলে না।

তৃতীয় তলার পূর্ব পাশে কর্নারের একটি কক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সুরভী হালদার। তিনি পদোন্নতি পেয়ে গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। তবে জিনজিরা হাসপাতালে তার ওই পদ না থাকায় মেডিকেল অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।

পাঁচ চিকিৎসকের মধ্যে নিয়মিত মাত্র একজন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতালে বিভিন্ন পদে মোট ২৮ জনবল থাকার কথা। এর মধ্যে ছয়জন চিকিৎসক, পাঁচজন সিনিয়র নার্স, জুনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন, গাইনি ও অবস, অ্যানেসথেশিয়া, মেডিকেল অফিসারসহ বিভিন্ন পদ রয়েছে। পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, অফিস সহকারী, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, ওয়ার্ড বয়, আয়া, নিরাপত্তা কর্মী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদও রয়েছে। কিন্তু এসব পদের বড় অংশই শূন্য বা সংশ্লিষ্টরা অন্যত্র সংযুক্তিতে থাকায় হাসপাতালে নিয়মিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতালের ফ্যাসিলিটি প্রধান হিসেবে ডা. মাহফুজা তুনহাকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে বদলি করা হলেও তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্তিতে রয়েছেন। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ডা. শাহানা আক্তার এবং পরবর্তীতে মাহফুজা খানমকে মেডিকেল অফিসার হিসেবে দেওয়া হলেও তারা হাসপাতালে নেই বলে জানা গেছে।

পাঁচজন সিনিয়র নার্স পদের বিপরীতে বর্তমানে চিত্রা রানী গোস্বামী, কামনা বেগম, সাবরিনা আক্তার রুবি ও আঁখি আক্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

দুপুরের পর চিকিৎসক মেলে না

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সকাল ৮টা থেকে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে রোগীরা স্লিপ কেটে অপেক্ষা করেন। কিন্তু দুপুর ১২টার পর চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

তারা বলেন, জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, ২৪ ঘণ্টার ট্রমা ও ফার্স্ট এইড সেবা, বহির্বিভাগ, প্যাথলজি, টিকাদান, পুরুষ ও নারী রোগীদের আলাদা ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহসহ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা জরুরি।

কোয়ার্টার-ডরমিটরি নিয়েও অভিযোগ

হাসপাতালের চিকিৎসক ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য নির্মিত কোয়ার্টারের কয়েকটি কক্ষ দখল করে তিনজন নার্স বসবাস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি কোয়ার্টার অবৈধভাবে ১১ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নার্সরা কোয়ার্টারকে ডরমিটরি হিসেবে দেখিয়ে তুলনামূলক কম ভাড়া দিচ্ছেন। একইসঙ্গে ডরমিটরিতে এসি লাগিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাসের অভিযোগও রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র (৫০ শয্যা মালঞ্চ হাসপাতাল) থেকে জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতাল পরিচালিত হয় বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক (গাইনি) সুরভী হালদার ও মেডিকেল অফিসার পুষ্পিতা শারমিন সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েকজন চিকিৎসককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডা. মাহফুজা তানহা ও একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডাক্তারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসি) সংযুক্ত করা হয়েছে।

তিনি ছয়জন ডাক্তার, পাঁচজন সিনিয়র নার্স, একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি ও অবস), একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেশিয়া), একজন মেডিকেল অফিসার, একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি), একজন ফার্মাসিস্টসহ ১৮ পদে ২৮ জনবল থাকার কথা উল্লেখ করেন। তবে জনবল কম থাকায় হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন জাকারিয়া মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, কয়েকজন চিকিৎসককে অন্য প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে হাসপাতালে পোস্টিং থাকা চিকিৎসকের অন্যত্র সংযুক্তির কারণে এখানে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। সকাল ৮টায় দায়িত্ব শুরু হয়ে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত থাকার নিয়ম। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে সরকারি অফিসগুলোতে হাজিরা পদ্ধতিতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস লাগানোর কথা বলেন।

ডরমিটরিতে এসি লাগিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস এবং কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি জানান। জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতালে নানা অনিয়মের কথা শুনেছেন জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন