প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র থেকে আজ খেলনা ফেরিওয়ালা। জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতায় শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও হার মানেননি মনোরঞ্জন চন্দ্র বর্মন। তার এই সংগ্রামী জীবনের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক আবেগঘন পোস্টে তুলে ধরেছেন তার শৈশবের বন্ধু মো. বরাতুজ্জামান জনি। তার পোস্ট হুবহু তুলে ধরা হলো:
‘আমার প্রাইমারি স্কুলের এক বন্ধু—শ্রী মনোরঞ্জন চন্দ্র বর্মন।
অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ছেলে ছিল সে। ক্লাসে ওর রোল ছিল দুই। ছোটবেলাতেই ওর হাতের লেখা ছিল এত সুন্দর যে সবারই ঈর্ষা হতো। ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য যখন আলাদা ক্লাস হতো, মনোরঞ্জন ছিল সবার মধ্যে সবচেয়ে মনোযোগী।
আনোয়ারুল স্যার, যিনি আমাদের খুব কড়া শাসন করতেন, তিনিও মনোরঞ্জনের হাতের লেখার প্রশংসা করতেন বারবার। হয়তো সেজন্যই, অজান্তেই, ওকে একটু হিংসা করতাম।
বৃত্তি পরীক্ষার মাসখানেক আগে হঠাৎ করে টানা দশ-বারো দিন মনোরঞ্জন স্কুলে আসেনি। একদিন খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি—মাথা ন্যাড়া, উঠোনে বসে কাঁদছে। জানতে পারলাম, ওর বাবা মারা গেছেন।
অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। সেই ছোট বয়সেই বিধবা মা আর ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে ওর কাঁধে। স্কুলে গেলে ঘরে না খেয়ে থাকতে হবে—এই কঠিন বাস্তবতার কাছে ওর পড়াশোনা থেমে যায়।
মনোরঞ্জন বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিল কিনা আজ আর মনে করতে পারছি না। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলেও সেভেনে ওঠার আগেই ওর শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে।

ছুটিতে বাড়ি এলে মাঝে মাঝে দেখা হয়। এখনো আগের মতোই লাজুক। হঠাৎ দেখা হলে ঠিকমতো কথা বলতে চায় না, যেন পালিয়ে যেতে চায়। কিছু জিজ্ঞেস করলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দু-এক শব্দে উত্তর দেয়—মনে হয় ভীষণ ব্যস্ত, সময় নেই।
এখন সে ফেরি করে বাচ্চাদের প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি করে। মেলা, ওয়াজ মাহফিল, উৎসব—যেখানে ভিড়, সেখানেই তার ব্যবসা। বিক্রি ভালো হলে মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
কয়েকদিন আগে চৌধুরাণী স্টেশনে সকাল সাতটার ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ দেখা—মনোরঞ্জনও মালামাল নিয়ে একই ট্রেনের অপেক্ষায়। ঈদের ছুটিতে পার্কে, নদীর ধারে মানুষ ঘুরতে যায় এরকম জায়গায় সারাদিন খেলনা বিক্রি করে সন্ধ্যার ট্রেনে আবার বাড়ি ফিরবে। সেদিন আর পালানোর উপায় ছিল না। ট্রেনের জন্য অপেক্ষমান দুই বন্ধু অনেকক্ষণ গল্প করলাম—হয়তো প্রাইমারি স্কুলের পর এত দীর্ঘ সময় আর কখনো কথা হয়নি আমাদের।
সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল—ট্রেনটা যদি একটু দেরি করত!
কিন্তু ট্রেন ঠিক সময়েই এলো। মনোরঞ্জন আবার জিতে গেল—পালানোর সুযোগ পেয়ে!
এখনকার বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় খেলনা নাকি কম বিক্রি হয়, আগের মতো লাভ হয় না—তবুও সে আশাবাদী। বলল, “সময় একদিন ঠিকই ভালো হবে।”আমি বললাম, “ঢাকায় গেলে হয়তো আরও ভালো কিছু করতে পারতি।”সে হেসে বলল, “ঢাকার আবহাওয়া খুব গরম, থাকতে খুব কষ্ট হয়। শ্রমজীবী মানুষের জন্য ঢাকায় জীবন-যাপন করা খুব কষ্টকর। গ্রামের খোলা হাওয়া, আলো-বাতাস—এটাই ভালো লাগে।”
জীবন তাকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে, কিন্তু আশাটা এখনো কাড়তে পারেনি।
অতঃপর ট্রেনের হুইসেল। আমরা যে যার মত ব্যস্ত হয়ে গেলাম।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

