পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা নিরসনে অবিলম্বে ভূমি কমিশন কার্যকর করতে হবে। এরজন্য কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন ও কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে। এই সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়৷ এটা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিকভাবেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
সোমবার ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একবছর , পাহাড়ের ভূমি সমস্যা নিরসনের লক্ষে ভূমিক মিশনকে সক্রিয়করণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এই দাবি জানান।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের আয়োজনে মতবিনিময় সভাটি ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় অংশ নেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শামসুল হুদা, বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুল ফিরোজ রশিদ, গণফোরাম এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।
মূল বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে ভূমি। পাহাড়ে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ এমনিতেই অত্যন্ত কম। ১৯৭৯ সাল থেকে দেশের সমতল জেলাগুলো থেকে পাহাড়ে কমপক্ষে চার লক্ষাধিক বহিরাগত লোক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই পার্বত্য ভূমি সমস্যা সমাধানে ৪ টি আশু করণীয় রয়েছে। সেগুলো হল: ভূমি কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ, পর্যাপ্ত জনবল, তহবিল ও পরিসম্পদ বরাদ্দকরণ এবং এই কমিশনের আইন সম্পর্কে জনগণকে যথাযথ ধারণা প্রদান করা, পাহাড়ের প্রচলিত রীতি, নীতি, পদ্ধতি সম্পর্কে প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সচেতন করা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার শামসুল হুদা বলেন, এই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্লোগান ছিল- বৈষম্য বিলোপ। শিক্ষার্থীরা অনেক গ্রাফিতি অঙ্কন করেছেন। সেখানে সকল ধরনের বৈষম্য নিরসনের কথা বলা আছে। ভূমি অধিকার, শিক্ষা, লিংক বৈষম্যসহ সকল ধরনের বৈষম্য নিরসনের শপথ নিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু এই সরকার তো পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে কোথাও হাত দিলেন না। আমরা দেখেছি পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে বার বার নাটক করা হত। এই চুক্তি তো কোনো ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির নয়৷ এটি রাষ্ট্রের সাথে পাহাড়ের আদিবাসীদের চুক্তি। কাজেই এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতেই হবে। আমরা সারা দেশে গণতন্ত্রের লড়াই করবো কিন্তু পাহাড় তার বাইরে থাকবে সেটা হবে না৷ কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুল রশীদ ফিরোজ বলেন, বর্তমানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। সরকার নানা কমিশন করেছে, সেগুলোতে ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর কার্যকর কোনো প্রতিনিধি নেই। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কোনো প্রতিনিধিই রাখা হয়নি। আর ঐক্যমত্য কমিশনকে দেখা গেছে যারা এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন তাদেরকে নিয়ে কিছু সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। কিন্তু যারা চুক্তি করেছেন এবং বাস্তবায়নের আন্দোলনে আছেন তাঁদের সাথে কোনো সংলাপ আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি ঐক্যমত্য কমিশন৷ কাজেই আমাদের লড়াই জারি রাখতে হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, পাহাড়ের সমস্যার অন্যতম বিষয় হল ভূমি সমস্যা। এর সমাধান ছাড়া বাকী বিষয়গুলোর অগ্রগতি অসম্ভব। সাধারণভাবে মনে করেছিলাম চুক্তি হলে, আইন হলে, বিধিমালা হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। কারণ, তাতে রাজনৈতিক সমঝোতা জোড়ালো হয়নি। যদি রাজনৈতিক সমঝোতাও হয় তবে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামরিক ও বেসামরিক আমলারা যে বড় ফ্যাক্টর, তাদেরকে আমরা একমত করতে পারিনি। কারণ, তাদেরকে একমত করা ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব না। মনে রাখতে হবে এই কমিশনতো আসলে মৌলবাদী গোষ্ঠীর তাঁবেদারিই করছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমার একটি গ্রাফিতি চোখে পড়েছে, সেটি হল-পার্বত্য চট্টগ্রামে ছত্রিশে জুলাই কবে হবে। গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, স্বৈরাচারী সরকার বিদায় নিয়েছে কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেখানে যা হচ্ছে তা মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে সেগুলো আসছে না৷ অন্যদিকে চলছে "ভাগ কর, শাসন কর" নীতি। এতে পাহাড়িদের মধ্যে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে প্রাণঘাতী রাজনীতি চলমান রয়েছে। সেখানে যে সেটলার বাঙালিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে তারা এখন মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই দশকে তাদের সংখ্যা আরো বাড়বে এবং পাহাড়ীরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। কাজেই রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান ব্যতীত কোনো বিকল্প আমি দেখছি না।
বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও কোন সরকারই কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেননি। তাই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ের মানুষজন যে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ সেটা কোনো সরকারই অনুভব করেনি। মনে করা হয় এই চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা অন্য দেশের, অন্য কেউ। আর সরকারের উচিত বিগত সরকারের আমলে পাহাড়ের কত ভূমি দখল করা হয়েছিল, অবৈধভাবে লীজ দেয়া হয়েছিল। সেসব প্রকাশ করার জোর দাবী জানাই। আর পাহাড়ের ভূমি সমস্যার সমাধানে ভূমি কমিশন কার্যকর করে ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যার সমাধান করা হোক।
গণফোরাম এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমি একটা বিষয় বুজি না পাহাড়ের রাজারা কেন সব সরকারের সাথে আপোষ করেছেন? আর কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করা হয়েছে তারাও আপোসমুক। যে বিচারপতিরা পার্বত্য ভূমি কমিশনের দায়িত্বে এসেছেন তারা কেউই কাজের ছিলেন না। অনেক শারীরিকভাবে অসুস্থ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা পাহাড়ে গিয়ে অফিসও করতে পারে না। ঢাকায় একটা অফিস রাখে, কেবলমাত্র মাসিক বেতনগুলো তোলার জন্য। এদের দিয়ে কোনো কাজ হবে না।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক খায়রুল চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়৷ এটা একটি রাজনৈতিক সমস্যার। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট যদি এই সরকার আমলে না নেয় তবে আগামীর যে সংকট আসবে সেটা কেউই ঠেকাতে পারবেন না। কাজেই এ সংকট সমাধানে রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

