রাজধানীর তুরাগে পারিবারিক কলহ শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল সাত মাস বয়সী এক শিশুর জীবন। অভিযোগ, স্ত্রীকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধের এক পর্যায়ে নিজের কোলের শিশুকন্যা রাফা মনিকে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সড়কের ওপর আছড়ে ফেলেন বাবা কবির হোসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনার পর অভিযুক্ত বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে তুরাগ থানা পুলিশ।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর তুরাগের কামারপাড়া সিরাজ মার্কেট এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় রাফা মনিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় চিকিৎসা চললেও বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ২টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তুরাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান ফয়সাল জানান, শিশুটির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত বাবা কবির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক বিরোধ থেকেই এ মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
শিশুটির মা লিমা বেগমের ভাষ্য, কয়েক মাস ধরেই সংসারে অশান্তি চলছিল। স্বামীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। ঘটনার দিন বিকেলে পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাকে মারধর করার পর তিনি মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। পরে সন্ধ্যায় কবির সেখানে এসে তাকে ফের বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পথে আবারও দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে কবির তার কোল থেকে রাফা মনিকে ছিনিয়ে নিয়ে সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলেন। মুহূর্তেই শিশুটি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। লিমা বলেন, “আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার মেয়েকে কোল থেকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর সবাই মিলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু আমার মেয়েকে আর বাঁচানো গেল না।”
শিশুটির নানি জানান, কবির হোসেন পেশায় রিকশাচালক। তবে নিয়মিত কাজ করতেন না। তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তিরও অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি প্রায়ই মেয়েকে মারধর করতেন বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের সংসারে সব সময় অভাব লেগেই থাকত। নেশা করে এসে অকারণে ঝগড়া করত। মেয়েকে মারধর করত। ভাবিনি নিজের সন্তানকেও এভাবে শেষ করে দেবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনার সময় রাস্তায় হঠাৎ চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। তখন রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এলাকাবাসীর দাবি, পারিবারিক সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সময়মতো কার্যকর সামাজিক ও পারিবারিক হস্তক্ষেপ হলে হয়তো এমন মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযোগপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জানা গেছে, অভিযুক্ত কবির হোসেনের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার গুচ্ছগ্রামে। জীবিকার তাগিদে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি তুরাগের কামারপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

