‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ : মেধাবীদের স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি

মারিয়াম নুরসাত

‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ : মেধাবীদের স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি

বাংলাদেশে এখনও অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, যাদের স্বপ্ন বড় হলেও বাস্তবতার দেয়াল অনেক উঁচু। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক সংকট কিংবা উপযুক্ত সহায়তার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই হারিয়ে ফেলে তাদের সম্ভাবনার পথ। এমন বাস্তবতায় কিছু উদ্যোগ শুধু সহায়তা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জীবনে নতুন আশার আলো হয়ে আসে। সিজেডএমের ‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ কর্মসূচি তেমনই একটি উদ্যোগ, যা মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। এই স্কলারশিপ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়, যেখানে তাদের শিক্ষাজীবন আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

জিনিয়াস স্কলারশিপের ইতিবৃত্ত

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজে প্রতিবছর এমন শত শত শিক্ষার্থী ভর্তি হন, যাদের পরিবারের পক্ষে পড়াশোনার ন্যূনতম ব্যয়ভার বহন করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত এই মেধাবীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডিএম) চালু করেছে ‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ কর্মসূচি। ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ যাকাত ও সদাকার তহবিলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে কীভাবে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন করা সম্ভব, সিজেডএম-এর এই উদ্যোগ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দেড় দশকের গৌরবময় পথচলা ও অর্জন

২০০৮ সালে যাত্রা শুরু সিজেডএম। প্রতিষ্ঠানটির জিনিয়াস স্কলারশিপ কর্মসূচি ২০১০ সালে চালু করার পর থেকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাড়িয়েছে অব্যাহতভাবে। এ পর্যন্ত দেশের ৯০ টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে এ যাবৎ ৮০০ টিরও বেশি সক্ষমতা উন্নয়ন সেশন সম্পন্ন হয়েছে। এই বৃত্তিপ্রাপ্ত বহু শিক্ষার্থী আজ পড়াশোনা শেষ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করছেন এবং নিজেদের পরিবারকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন।শিক্ষাজীবনে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) ‘জিনিয়াস বৃত্তি পেয়েছিলেন, বর্তমানে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত এমনই একজন জনাব ইদ্রিস আলী, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। তিনি বলেন, “জিনিয়াস বৃত্তি আমার কাছে শুধু একটি আর্থিক সহায়তা ছিল না; এটি ছিল কঠিন সময়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা ও অবলম্বন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বহুবার মনে হয়েছে অর্থাভাবে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব না। ঠিক সেই সময় সিজেডএমের এই বৃত্তি আমার থাকা-খাওয়া ও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্যাপাসিটি বিল্ডিং সেশনগুলো আমাকে নৈতিক মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আজ আমি কর্মজীবনে যে অবস্থানে পৌঁছেছি, তার পেছনে জিনিয়াস বৃত্তি কর্মসূচির অবদান গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অসংখ্য মেধাবী অথচ আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা উন্নয়ন মডেল

সিজেডএম জিনিয়াস স্কলারশিপ কর্মসূচি কেবল প্রতি মাসে কিছু অর্থ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক জীবনের মানোন্নয়ন এবং তাকে একজন দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ। এই কর্মসূচির প্রধান কার্যক্রমগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

মাসিক উপবৃত্তি: নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায়ের আড়াই বছর (৩০ মাস) নিয়মিত মাসিক উপবৃত্তি প্রদান করা হয়, যাতে তারা কোনো আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে।

ক্যারিয়ার ও দক্ষতা উন্নয়ন: বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেশন, জীবনমুখী দক্ষতা, এবং আধুনিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা: গ্রামীণ বা সুবিধাবঞ্চিত পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যাতে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং মানসিক ট্রমা বা হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারে, সেজন্য পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

সামাজিক সেবায় অংশগ্রহণ: শিক্ষার্থীদের মাঝে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সিজেডএম-এর বিভিন্ন জীবিকায়ন ও মানব উন্নয়ন কর্মসূচিতে তাদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত করা হয়।

এই কর্মসূচির অন্যতম দূরদর্শী উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের 'যাকাতের ভবিষ্যৎ অ্যাম্বাসেডর' হিসেবে গড়ে তোলা। আজ যারা অভাবের কারণে যাকাতের অর্থ দিয়ে নিজেদের পড়াশোনা চালাচ্ছেন, সিজেডএম-এর লক্ষ্য হলো— সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী দিনে তারা যেন নিজেরাই স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে যাকাত দাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। এভাবে সমাজের সম্পদ বৈষম্য দূর করে একটি সাম্যবাদী ও সচ্ছল সমাজ গঠন করাই এই প্রকল্পের মূল দর্শন।

স্বচ্ছতা ও আবেদন প্রক্রিয়া

সিজেডএমের জিনিয়াস বৃত্তির জন্য এবারের আবেদন শুরু হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজে (কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ছাড়া) স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে শর্ত হলো, আবেদনকারী শিক্ষার্থীর পরিবারকে অবশ্যই যাকাত গ্রহণের উপযোগী বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হতে হবে এবং কোনো ধরনের অনৈতিক বা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকা যাবে না। সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক এই বৃত্তির পরিমাণ ও সংখ্যা মূলত যাকাত তহবিল এবং দাতার প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।

শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ৪,০০০ টাকা হারে মাসিক বৃত্তি প্রদান করা হয়। সাধারণত স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ের প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে দুই থেকে আড়াই বছর (সর্বমোট ৩০ মাস) পর্যন্ত এই আর্থিক সহায়তা চালু থাকে। প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণত ১২ মাসের (১ বছর) জন্য প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীর সন্তোষজনক একাডেমিক ফলাফল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের ওপর ভিত্তি করে বৃত্তির মেয়াদ পরবর্তী শিক্ষাবর্ষগুলোর জন্য নবায়ন বা বর্ধিত করা হয়ে থাকে।

সম্পূর্ণ অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় এই বৃত্তির আবেদন গ্রহণ করা হয়। কোনো প্রকার তদবির বা অনৈতিক প্রভাবের সুযোগ না রেখে অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার সাথে মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত হকদারদেরই এই বৃত্তির জন্য চূড়ান্ত করা হয়। চলতি জুলাই মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে এই ঠিকানায়: https://scholarship.czm-bd.org/

ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ

বিশ্বজুড়ে উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। কারণ একটি শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্মই পারে একটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে। বাংলাদেশেও এখন এমন মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজন আরও বেশি। সিজেডএমের ‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ সেই প্রয়োজনের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। যদি এই ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী নতুনভাবে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পাবে।

একজন শিক্ষার্থীর হাতে যখন বইয়ের পাশাপাশি স্বপ্নের আলোও তুলে দেওয়া হয়, তখন সে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ বদলায় না—বদলে দিতে পারে পুরো সমাজকেও। আর সেই পরিবর্তনের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে সিজেডএমের ‘জিনিয়াস স্কলারশিপ’ কর্মসূচি।

‘জিনিয়াস বৃত্তি” কর্মসূচির পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, “অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেন না যে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী কখনো দিনে মাত্র একবেলা খেয়ে জীবনযাপন করেন, আবার কেউ দৈনিক তিন বেলার খাবারের জন্য মাত্র ৬০–৭০ টাকা ব্যয় করেন। অনেক শিক্ষার্থী ১০–১৫ দিনেও একবার মাংস খেতে পারেন না। কেউ রিকশা চালিয়ে, কেউ রাজমিস্ত্রির সহকারী, আবার কেউ দিনমজুর হিসেবে কাজ করে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ চালিয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু জিনিয়াস বৃত্তির ভাইভা বোর্ডে যখন শিক্ষার্থীরা তাদের বাস্তব জীবনের এসব সংগ্রামের কথা তুলে ধরে, তখন অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আমাদের বোর্ড সদস্যরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে প্রচলিত অধিকাংশ বৃত্তি মূলত মেধার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়। ফলে আর্থিকভাবে সবচেয়ে অসচ্ছল অথচ মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। সিজেডএমের ‘জিনিয়াস বৃত্তি” কর্মসূচির মূল দর্শন ভিন্ন। এখানে শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা, যাকাতের প্রকৃত হকদার হওয়া এবং উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি বৃত্তি প্রদান নয়; বরং একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যেন দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন