তেরো বছর বয়সী কিশোরী সিমি হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন শিশুটির মা চাঁদনী। পাশাপাশি সিমির ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ, জোরপূর্বক মাদক সেবন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চান তিনি। এসব অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েও পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাননি বলেও দাবি করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন চাঁদনী। তিনি সিমির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য, ডিজিটাল প্রমাণ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, সম্ভাব্য ভিডিও এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দাবি জানান। চাঁদনী বলেন, আমি কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। আমি শুধু চাই, সত্য ঘটনা সামনে আসুক এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অবহেলা হয়ে থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।
সংবাদ সম্মেলনে শিশুটির মা জানান, গত ১৫ জুলাই রাতে মৃত্যুর আগে বাসায় ফেরার পর মেয়ের আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিমি তাঁর ওপর রাগ করে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভাঙা হয়। তখন সিমিকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ১৬ জুলাই মেয়ের মরদেহ নিয়ে বনানী থানায় যান চাঁদনী। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর পুলিশ সিএনজি থেকে মরদেহ নামায় এবং তাঁর অভিযোগ গ্রহণ না করে অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করার আবেদন জানালে আদালত জানায়, নতুন করে মামলা করার সুযোগ নেই; পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাতে সন্তুষ্ট না হলে পুনঃতদন্তের আবেদন করতে পারবেন। চাঁদনী বলেন, তাঁর অভিযোগের একটি বড় অংশ পুলিশের দায়িত্ব পালনে অবহেলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পুলিশের বর্তমান তদন্তেই ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে তার মনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে চাঁদনী জানান, গত ২০ মে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সিমি স্কুলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় তিনি স্কুলে খোঁজ নেন। সেখানে মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে সন্ধ্যায় বনানী থানায় বিষয়টি জানান। এরপর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিক তদন্ত শুরু করেন। ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ সিমিকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেয়। এ সময় একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও কীভাবে বা কোথা থেকে মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে, তা তাঁকে জানানো হয়নি। এমনকি সিমিকে এ বিষয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করতেও নিষেধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এসব বিষয়ে অভিযোগ জানাতে গত ৮ জুলাই বিকেল পৌনে চারটার দিকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আবারও বনানী থানায় যান। তখন দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক শাকিল তাঁদের বক্তব্য শোনেন। তবে সিমিকে যেহেতু এসআই রফিক উদ্ধার করেছিলেন, তাই তিনি এলেই বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। পরে রফিক থানায় এলে তাঁকে পুরো ঘটনা জানিয়ে সাইদুর ও টুম্পার ছবি দেখানো হয়। এরপরও ওই দিন রাত আটটা পর্যন্ত দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো তাকে পরদিন থানায় আসতে বলা হয়। এভাবে দিনের পর দিন তাঁকে ঘুরিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিমির মৃত্যুর আগে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় যাননি। কিন্তু শিশুটির মার দাবি, পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
সংবাদ সম্মেলনে চাঁদনী জানান, তিনি রাজধানীর মহাখালীর একটি বাসায় মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দারোয়ানের মাধ্যমে সাইদুর ও টুম্পা নামের এক দম্পতি তাঁদের দুই সন্তানসহ ওই বাসায় সাবলেট হিসেবে ওঠেন। তাঁদের গতিবিধি ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় তাঁরা ১ মে বাসা ছেড়ে চলে যান। পরে ওই দম্পতির মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে চাঁদনী আট দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—সিমির মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অভিযোগে উল্লেখিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, বনানী থানায় অভিযোগ জানানো নিয়ে তাঁর ও পুলিশের বক্তব্যের অমিল যাচাই এবং দায়িত্বে কোনো অবহেলা বা অসদাচরণের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যসহ সব ধরনের প্রাসঙ্গিক আলামত আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ ও পরীক্ষা, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের নিয়মিত অবহিত করার দাবি জানান তিনি।
গণমাধ্যম, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও দেশের সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায়। একজন মা হিসেবে মেয়ের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানার অধিকার আমার রয়েছে।’ তিনি সিমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দ্রুত ন্যায়বিচার দাবি করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


