জঙ্গিবাদের ভারতীয় বয়ান ও নিরাপত্তা-হুমকি

জঙ্গিবাদের ভারতীয় বয়ান ও নিরাপত্তা-হুমকি

আগস্টের শুরু থেকেই বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ নিয়ে হঠাৎ বেশ কিছু প্রতিবেদন সামনে এসেছে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যমেও একই ধরনের খবর ও বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে।

যেমন গত ১৯ আগস্ট ডয়চে ভেলে বাংলার একটি সংবাদের শিরোনাম—‘বাংলাদেশে কি আবার জঙ্গি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে?’ বিবিসি বাংলার কয়েকটি শিরোনাম—‘পরপর দুটি বোমা উদ্ধারের মধ্যেই পুলিশের সতর্কতা জারি, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক’, “উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে”, ‘হোলি আর্টিজানের এক দশক, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে নাকি কমেছে’, ‘বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও আল কায়েদা ইস্যু আবার কেন আলোচনায়?’ কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ একটি লেখা প্রকাশ করেছে। ইফতেখারুল বাশার লিখিত এই নিবন্ধের শিরোনাম ‘Bangladesh’s Evolving Security Crisis: The Rise of Religious Extremism Amid Political Transition’ (বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা সংকট : রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান)।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে কি সত্যিই জঙ্গিবাদের বড় ধরনের উত্থান ঘটছে; নাকি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, কিছু সন্দেহ, কিছু আশঙ্কা এবং কিছু পুরোনো তথ্যকে একসঙ্গে জুড়ে একটি বড় নিরাপত্তা-বয়ান তৈরি করা হচ্ছে? প্রশ্নটি করা জরুরি। কারণ জঙ্গিবাদ নিঃসন্দেহে গুরুতর বিষয়। কোনো দেশে উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা থাকলে সেটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। বোমা উদ্ধার হলে তদন্ত করতে হবে। বিস্ফোরক পাওয়া গেলে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। নিষিদ্ধ সংগঠন মিছিল করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব নিয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণিত সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কা—এই দুই বিষয় এক নয়। একটি অপরাধের ঘটনা আরেকটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি—এ দুটিকেও এক করে দেখা যায় না।

ডয়চে ভেলের ১৯ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে থাকা ৩৩৮ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একই প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের কথাও এসেছে। এগুলো অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। এখানেই গণমাধ্যমের দায়িত্ব।

‘জঙ্গি’ শব্দটির ব্যবহারে কি যথেষ্ট সতর্কতা রয়েছে?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা অধ্যয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে—securitization, বাংলায় যাকে নিরাপত্তায়ন বলা যায়। কোপেনহেগেন স্কুলের নিরাপত্তা তত্ত্বে ব্যারি বুজান, ওলে ওয়েভার ও জ্যাপ দে উইল্ড দেখিয়েছেন, কোনো বিষয়কে শুধু বাস্তব হুমকি হিসেবে দেখা হয় না। রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যের মাধ্যমেও কোনো বিষয়কে ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। তখন সেটি স্বাভাবিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় হয়ে ওঠে।

এই জায়গাটি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি বোমা পাওয়া গেল। সেটি অপরাধের ঘটনা। তদন্ত হবে। কিন্তু তার সঙ্গে যদি যুক্ত করা হয়—রাজনৈতিক পালাবদল, ইসলামপন্থার উত্থান, তরুণদের উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়া, আন্তঃদেশীয় জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—তাহলে একটি বড় বয়ান তৈরি হয়। সেই বয়ানটি হতে পারে সত্য। আবার অতিরঞ্জিতও হতে পারে। সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের একমাত্র পথ হলো প্রমাণ।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে শুধু ‘ডানপন্থার উত্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বড় একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ পড়ে যায়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা ও নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করা; গুম, খুন, অবিচারসহ দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আপামর জনসাধারণের পুঞ্জীভূত তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। এই পটভূমি বাদ দিয়ে যদি পুরো ঘটনাকে শুধু ‘ডানপন্থার উত্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সেটা গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও অংশগ্রহণকে কেবল অবজ্ঞা নয়, বরং অদৃশ্য করে দেওয়ার শামিল। একই সঙ্গে সেটা শেখ হাসিনার মাফিয়াতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাসহ সব অন্যায় আর অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার পর্যায়ে পড়ে।

জঙ্গিবাদ নিয়ে সংবাদ করতে হলে জঙ্গিবাদ নিয়ে তথ্য দিতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ব্যাখ্যা করতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবাদ কোনো শূন্যস্থানে জন্ম নেয় না। সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্থা ক্রেনশের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সন্ত্রাসবাদকে তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না। তার কাজ বারবার দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত, রাষ্ট্র ও বিরোধী শক্তির সম্পর্ক এবং নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সন্ত্রাসবাদের কারণ ও বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু ‘জঙ্গি আছে কি নেই’—এটি নয়; প্রশ্ন হলো, ‘কেন আছে? কোথায় আছে? কতটা সক্রিয়? তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা কতটুকু? বিদেশি যোগাযোগ আছে কি না? অর্থের উৎস কী? তাদের জনসমর্থন কতটা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য কী বলছে?’ এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘জঙ্গিবাদ বাড়ছে’ বলা সাংবাদিকতা নয়। এটি একটি অনুমান এবং একই সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সিঙ্গাপুরের প্রতিবেদনটিও কি প্রশ্নের বাইরে? সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে ইফতেখারুল বাশারের লেখা একটি প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রতার প্রবণতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

কোনো দেশে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক সক্রিয়তা আর জঙ্গিবাদ এক জিনিস নয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া, শরিয়াহভিত্তিক রাজনীতির দাবি করা বা রক্ষণশীল সামাজিক অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে। এটাকে যারা ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে তাদের হীন উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

এটা সবার জানা, জুলাই বিপ্লবকে ভারত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তারা মনে করে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—জুলাই বিপ্লবের কেবল ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হয়নি, ভারতের আধিপত্যবাদেরও পতন হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের মিডিয়া যেভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেমেছিল—সেটি ছিল অবাক করার মতো। কিন্তু ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র থামিয়ে দিয়েছে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ কারণেই বাংলাদেশের কথিত জঙ্গিবাদ নিয়ে ভারতের মিডিয়া কী লেখে, কী ধরনের বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালায়—এ বিষয়টির ব্যাপারে সজাগ থাকতেই হবে।

বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে প্রভাবিত করে। আবার বাংলাদেশের গণমাধ্যমও অনেক সময় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে নিজেদের সংবাদের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হতে পারে। ভারতীয় একটি মাধ্যম লিখল—বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যম সেটি উদ্ধৃত করল। এরপর অন্য একটি মাধ্যম লিখল—বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ। কয়েক দিনের মধ্যে একটি সংবাদই হয়ে গেল ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাস্তবতা’। এটি সংবাদ পরিবেশনের একটি পরিচিত সমস্যা। একই তথ্য বারবার প্রকাশিত হলে সেটি সত্যের চেয়ে বেশি সত্য বলে মনে হতে পারে। তাই সূত্রের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। একই তথ্যের জন্য পাঁচটি সংবাদমাধ্যম যদি একটি সূত্রের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি পাঁচটি স্বাধীন তথ্য নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের লেখা উদ্ধৃতি করার ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

বোমা উদ্ধার মানেই কি জঙ্গিবাদ?

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমাসদৃশ বস্তু ও ককটেল উদ্ধারের খবর এসেছে। কিন্তু প্রতিটি বোমা বা ককটেলের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের সম্পর্ক আছে—এমন সিদ্ধান্ত তদন্তের আগে দেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যদি বলে, দেশে বড় ধরনের জঙ্গি তৎপরতার প্রমাণ নেই, তাহলে সেটিও সংবাদে সমান গুরুত্ব পেতে হবে। কারণ সাংবাদিকতার কাজ আতঙ্ক তৈরি করা নয়, সাংবাদিকতার কাজ তথ্য যাচাই করা।

একটি বোমা উদ্ধার হয়েছে—এটি খবর। কিন্তু ‘বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের কবলে’—এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক সিদ্ধান্ত। এর জন্য অনেক বেশি প্রমাণ প্রয়োজন। মার্থা ক্রেনশের গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, বিশ্লেষণ যেন শুধু ঘটনাকেন্দ্রিক না হয়। কারণ সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়াও রাষ্ট্রীয় নীতি ও সমাজের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ আতঙ্কও একটি রাজনৈতিক শক্তি।

বাংলাদেশের জন্য আসল ঝুঁকি কোথায়? বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি অবশ্যই আছে। কোনো রাষ্ট্রই উগ্রবাদ থেকে মুক্ত নয়। ঝুঁকি আছে অনলাইন র‌্যাডিক্যালাইজেশনে। ঝুঁকি আছে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া পুরোনো জঙ্গিদের পুনর্গঠনে। ঝুঁকি আছে অস্ত্রের অবৈধ বিস্তারে। ঝুঁকি আছে সীমান্তপারের নেটওয়ার্কে। ঝুঁকি আছে রাজনৈতিক সহিংসতায়। কিন্তু আরেকটি ঝুঁকিও আছে। সেটি হলো প্রতিটি রাজনৈতিক বিরোধিতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে এক করে দেখা। এতে প্রকৃত জঙ্গিবাদ চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়।

হার্ভার্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবলাট দেখিয়েছেন, চরম রাজনৈতিক মেরূকরণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক সহনশীলতাকে দুর্বল করতে পারে। তারা সতর্ক করেছেন, যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অস্তিত্বের শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন গণতন্ত্রের জন্য বিপদ বাড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শিক্ষা পরিষ্কার। জঙ্গিবাদ ইস্যু মোকাবিলায় শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা, পেশাদার পুলিশ, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমকেও একই সঙ্গে দায়িত্বশীল হতে হবে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ: বাস্তবতা ও প্রচারণা

ধর্মীয় উগ্রবাদ কোনো এক দেশের সমস্যা নয়। পাকিস্তানে আছে। ভারতেও আছে। ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ এখন বড় শক্তি। পাকিস্তানে ধর্মীয় উগ্রবাদ দীর্ঘদিনের সংকট। আর ইসরাইল তো উগ্রবাদী দেশ। সরকারই উগ্রবাদের ধারক ও বাহক। বাংলাদেশেও উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। কিন্তু উদ্বেগ আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

জঙ্গিবাদের পেছনে একটিমাত্র কারণ কাজ করে না। দারিদ্র্য বা বেকারত্ব থাকলেই কেউ জঙ্গি হয় না। একই বাস্তবতায় অসংখ্য মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। কেউ সংগঠনের আদর্শে আকৃষ্ট হয়। কেউ নেতার প্রভাবে যায়। কারো কাছে এটি রোমাঞ্চের বিষয়ও হতে পারে। তাই ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও মানসিক আকর্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণভাবে জঙ্গিবাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে চারটি বিষয় কাজ করতে পারে—সামাজিক-অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক ক্ষোভ। বৈষম্য ও বঞ্চনা যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি রাজনৈতিক অধিকার হরণ, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনও ক্ষোভ তৈরি করে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। উগ্রবাদের কারণ ও উগ্রবাদ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশে হুজি, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল-ইসলামসহ বিভিন্ন সংগঠনের নাম মানুষ শুনেছে। এসব সংগঠন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যও এসেছে। তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এসব সংগঠনের বাস্তব যোগাযোগের তথ্য বরাবরই সীমিত। জেএমবির ক্ষেত্রে আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের কারণে বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়েছিল।

হাসিনার সময় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ শব্দটি একসময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক মতকে দমন করতে ‘জঙ্গি’ তকমা দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশকে কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন দেশটি জঙ্গিদের অভয়ারণ্য। নিয়মিত কথিত জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কার, অভিযান, গ্রেপ্তার এবং নাশকতার গল্প সামনে আসত। অথচ জুলাই বিপ্লবের পর সেই কথিত জঙ্গি আস্তানাগুলোর অনেকগুলোর আর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে সরকারের আমলে নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছিল, বিরোধী মত দমন করা হয়েছে, সেই সরকারের সমর্থনে যারা নীরব ছিলেন বা বয়ান তৈরি করেছিলেন, তাদের একটি অংশ এখন বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বিষয়টি তাই শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে রাজনীতিও জড়িয়ে থাকতে পারে।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এখন নতুন বাস্তবতা। জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল। তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। জনগণ তাদের ভোট দেবে কি না, সেটি জনগণের সিদ্ধান্ত। কোনো রাজনৈতিক দলকে শুধু তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে জঙ্গি বা উগ্রবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশি সমাজের একটি বড় শক্তি হলো—সাধারণ মানুষ ধর্মীয় সহিংসতা ও জঙ্গিবাদকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না। আলেম সমাজও উগ্রবাদের বিরোধী। এই সামাজিক প্রতিরোধ বাংলাদেশের বড় সম্পদ।

প্রথম প্রয়োজন সুশাসন। গণতন্ত্র যত শক্তিশালী হবে, মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যত বাড়বে, বিচারব্যবস্থা যত নিরপেক্ষ হবে এবং রাষ্ট্র যত বেশি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে, উগ্রবাদের জন্য জায়গা তত সংকুচিত হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দমন, বৈষম্য, দুর্নীতি, বিচারহীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভকে ষড়যন্ত্রকারীরা কাজে লাগাতে পারে।

তাই বাংলাদেশের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো—উগ্রবাদকে অস্বীকার করা নয়, আবার অতিরঞ্জিত করাও নয়। বাস্তব হুমকি থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কারণ আতঙ্ক দিয়ে কোনো দেশ নিরাপদ হয় না; নিরাপত্তা তৈরি হয় আস্থা দিয়ে, ন্যায়বিচার দিয়ে, গণতন্ত্র দিয়ে এবং সুশাসন দিয়ে।

বাংলাদেশে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ আসলে বাংলাদেশের মানুষই। এই শক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে পারলে জঙ্গিবাদ ইস্যুও মোকাবিলা করা যাবে। আর জঙ্গিবাদ নিয়ে তৈরি করা রাজনৈতিক গল্পের প্রয়োজনও তখন অনেকটাই কমে যাবে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে দেওয়া যাবে না। ভারতীয় মিডিয়া কী বলছে, বিবিসি কী বলছে, ডয়চে ভেলে কী বলছে—সেটিও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রমাণ হলো মাঠের তথ্য। গ্রেপ্তার হলো কে? কোন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ পাওয়া গেল? অর্থ কোথা থেকে এলো? অস্ত্র কোথা থেকে এলো? কী ধরনের প্রশিক্ষণ ছিল? কোন বিদেশি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল? কতগুলো ঘটনা ঘটেছে? সেগুলোর কতগুলো সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর চাই।

আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন বাংলাদেশকে কি আবারও একটি ‘নিরাপত্তা-হুমকির রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখানোর নতুন বয়ান তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্যও জরুরি।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন