ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়েছে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন পারভেজ ও আহনাফ আবির আশরাফুল্লাহকে স্মরণ করে তাঁদের আদর্শ ও আত্মত্যাগের চেতনায় শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
মঙ্গলবার আশুলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য ড. মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, জুলাই বিপ্লবে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দুই শহীদ শাকিল পারভেজ ও আহনাফকে স্মরণ করে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে এক একজন শাকিল ও আহনাফ হয়ে গর্জে উঠতে হবে। তাদের কণ্ঠে বলতে হবে—‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ। যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই বিপ্লব—প্রতিটি আন্দোলনেই ছাত্রসমাজ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। এই জেন-জি প্রজন্মই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে পথ দেখাবে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবে শহীদ শাকিল পারভেজ, শহীদ আহনাফ আবির আশরাফুল্লাহসহ সকল শহীদের স্মরণে আলোচনা সভা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
বক্তব্যে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, জুলাই বিপ্লবে ছাত্ররা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান তুলেছিল। ন্যায়বিচার কখনও পরাজিত হয় না। সত্যের বিজয় হবেই, মিথ্যার পতন অনিবার্য। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা ‘ভার্সন থ্রি বাংলাদেশ’ গড়তে সক্ষম হব।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি যে এমন ঘটনা ঘটবে। এটি প্রমাণ করেছে, জুলাই বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক বিজয় ছিল না। আমি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে যতটা গর্বিত, তার চেয়েও বেশি গর্বিত যে আমি ২০২৪ সালের জুলাই পেয়েছি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের এই দিনেই ‘পরশু নয়, আগামীকালই লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই চেতনা ধারণ করে আজ আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে—সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ, কবিতা, গান, চিত্রকর্ম, কার্টুন, নাটক ও নাটিকার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে সর্বপ্রথম শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ওপর আঘাত এসেছিল। সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব তিনি নিজের জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, এ জাতির ইতিহাসে বারবার জুলাই ফিরে এসেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই—সবই পরিবর্তনের মাইলফলক।
জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, একদিকে জুলাই সফল, অন্যদিকে এখনও অসম্পূর্ণ। সফল এ কারণে যে, ১৯৭৫ সালের মতো আমাদের হাত রক্তে রঞ্জিত করতে হয়নি; অন্যদিকে ব্যর্থ এ কারণে যে, এখনও এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠেনি যেখানে আর কোনো জুলাইয়ের প্রয়োজন হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মো. মনিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ডিন অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুলাই বিপ্লবে শহীদ ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন পারভেজের বাবা মো. বেলায়েত হোসেন এবং ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আহনাফ আবির আশরাফুল্লাহর মা মোছা. আছিয়া খাতুন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনোমিকসের ডিন মো. মাহবুব আলম, স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের ডিন ড. আবু আইয়ুব মো. ইব্রাহিম, রেজিস্ট্রার এ.এইচ.এম. আবু সাঈদ, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে আজাদী শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশনায় জুলাইয়ের গান, দেশাত্মবোধক গান, ইসলামী সংগীত, কাওয়ালি, নাটক ও নাটিকা পরিবেশিত হয়। ডিবেট ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় প্ল্যানচিট বিতর্ক। শেষে জুলাই বিপ্লব স্মরণে আয়োজিত রচনা ও স্মৃতিলিখন, ডকুমেন্টারি ও পোস্টার নির্মাণ এবং আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুলাই লক্ষ্মীপুরে শহীদ শাকিল হোসেন পারভেজের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে টাঙ্গাইলে শহীদ আহনাফ আবির আশরাফুল্লাহর কবর জিয়ারত, আন্তঃবিভাগ জুলাই স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট, পোস্টার ও ডকুমেন্টারি নির্মাণ, স্মৃতিলিখন ও রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রক্তদান এবং রক্তের গ্রুপ নির্ণয়সহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ক্লাব, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ক্লাব, ইইই ক্লাব, ডিবেট ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, ইংলিশ ক্লাব, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, ফার্মেসি ক্লাব, ইসলামিক স্টাডিজ ক্লাব, ল’ ক্লাব এবং ছাত্র বিষয়ক বিভাগ যৌথভাবে এ আয়োজন বাস্তবায়ন করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


