জুলাই আন্দোলনে যাওয়ার আগে ওসমান পাটওয়ারী মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে গালে চুমু খেয়ে বলেছেন, আম্মু তুমি আমাকে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফু দিয়ে দাও, আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন। বাবাকে বলেন, আব্বু আমি আন্দোলনে যাব। তোমার সঙ্গে হয়ত আমার আর দেখা হবে না, আমাকে মাফ করে দিও।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন আন্দোলনে শহীদ ওসমান পাটওয়ারীর পিতা আব্দুর রহমান। জুলাই বিপ্লবে গণহত্যার ঘটনায় ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি।
জবানবন্দিতে আব্দুর রহমান বলেন, আমার ছেলে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনে অংশ নেয়। তখন আমি ঢাকা অবস্থান করছিলাম। বিকেল ৪টার দিকে একজন আমাকে ফোন করে বলেন, এই ফোনের ছেলেটি মারা গেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলে আমাকে জানায় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে মারা গেছেন। আমি তখন আমার পরিচিত লোকজনদেরকে লক্ষীপুর সদর হাসপাতালে পাঠাই। তারা আমাকে নিশ্চিত করে , আমার ছেলে ওসমান শহীদ হয়েছে। আমি তাদেরকে লাশ বাড়িতে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য বলি। কিন্তু আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা হাসপাতাল ঘেরাও করে রাখে এবং তারা লাশ আনতে দেয়নি। অনেক আকুতি-মিনতি করার পর লাশ বাড়িতে আনার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় কিন্তু ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর ছেলেরা রাস্তায় ৫ বার অ্যাম্বুলেন্স থামায় এবং বলে লাশ বাড়িতে নেওয়া যাবে না। এরপর বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে লাশ বাড়িতে আনা হয়।
আব্দুর রহমান বলেন, রাত তিনটার দিকে আমি বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার ছেলে শহীদ ওসমান পাটোয়ারীর নিথর দেহ পড়ে আছে। স্থানীয় লোকজন আমাকে ধরাধরি করে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরদিন ৫ আগস্ট জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে লোকজনের কাছে আমি জানতে পারি, লক্ষ্মীপুর পিংকী প্লাজার সামনে ওসমান গুলি খেয়ে মেইন রোডের ওপর পড়েছিল। আওয়ামী লীগের তাহেরের ছেলে সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা ছাদ থেকে ও নীচ থেকে গুলি করে আমার ছেলেসহ আরো ২ জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে। ৪ আগস্ট সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা মাদাম ব্রিজের উপর আফনান নামে এক আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে। টিপু ও তার ছোট ভাই বিপ্লব, শাহীন, শিবলুসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমার ছেলেসহ লক্ষ্মীপুরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে ওসমান পাটোয়ারী শহীদ হওয়ার বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে ময়না তদন্ত করা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনেছি, আমার ছেলের শরীর থেকে ৭ টি গুলি বের করা হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ৫৫ টি গুলির চিহ্ন ছিল। ছেলের লাশ দাফনের সময় লক্ষীপুর এলাকায় বন্যা চলছিল। পানির মধ্যে রেখে দাফন করি। লাশ ময়না তদন্তের জন্য দাফনের ১ মাস ১ দিন পর তোলার সময় আমি কবরের পাশে ছিলাম। লাশ যখন তোলা হয়, তখন ছেলের লাশ আমি যেভাবে রেখেছিলাম ঠিক সেই অবস্থায় দেখতে পাই। কোন পচন ধরে নাই। আমি এবং উপস্থিত লোকজন তা দেখে আশ্চর্য হই। উপস্থিত লোকজন বলে, শুনেছি শহীদের লাশ নষ্ট হয় না, আজ নিজ চোখে তা দেখতে পেলাম। এই পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
সবশেষে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, ইনান, নানক, পরশ, সাদ্দাম, আরাফাত, বাহাউদ্দিন নাছিম, নিখিলসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীদের নির্দেশে ও উসকানিতে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আমার ছেলেসহ অন্যান্য হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শান্তি চাই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

