জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চার আসামির বিরুদ্ধে অষ্টম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জুম্মান।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সদস্য শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে জবানবন্দি দেন তিনি। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দিতে মেহেদী হাসান বলেন, আমার বর্তমান বয়স ২৪ বছর। আমি ঢাকা কলেজের দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আমি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শুরু থেকেই যোগদান করি। ১৮ জুলাই মালিবাগ-রামপুরা রোডে আবুল হোটেলের সামনে আন্দোলনে অংশ নিই। এদিন সকাল ১০টার দিক থেকে আমি ছররা গুলিতে আহত হই। এরপর ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর আমরা প্রায় হাজারখানেক ছাত্র-জনতা রামপুরা বাজারের দিকে অবস্থান নিই। তখন রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে ফুটওভার ব্রিজের নিচে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নেয়। তারা অনবরত রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। তারা ৫ মিনিট পরপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে থাকে। আমার সামনেই তখন কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। একজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আমরা কয়েকজন আহতদের নিয়ে রামপুরা ওয়াপদা রোডে স্থাপিত রেড ক্রিসেন্টের একটি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাই।
জবানবন্দিতে এই সাক্ষী আরও বলেন, পরে শুনতে পাই, তাদের মধ্যে অনেকেই মারা যায়। তাদের ক্যাম্পে রেখে আমি পুনরায় আন্দোলনে যোগ দিই। আনুমানিক বিকেল ৫টার দিকে আমি রামপুরা ডেল্টা হাসপাতালের সামনে অবস্থানকালে বিজিবি ও পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হই। একটি গুলি আমার ডান পায়ের হাঁটুর একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলির চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। সাক্ষী এ পর্যায়ে তার হাঁটুর গুলির ক্ষতচিহ্ন ট্রাইব্যুনালকে দেখান। গুলিবিদ্ধ হয়ে আমার নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে আমাকে সাপোর্ট নিয়ে হাঁটতে হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েকজন আমাকে রেড ক্রিসেন্টের অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আমাকে বাড্ডা এএমজেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আমার হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করা হয়, কিন্তু সরকারের নির্দেশনা থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি করেনি। ওই দিন রাতেই আমি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যাই। সেখানে আমাকে গুলিবিদ্ধ হিসেবে ভর্তি না করে হাড়ে যখমপ্রাপ্ত হিসেবে ভর্তি দেখানো হয়। সেখানে আমি ভর্তি থাকা অবস্থায় ২৫ জুলাই সিআইডি পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু আমার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আমাকে সেখানেই পুলিশ পাহারায় রাখা হয়। ৫ আগস্ট আমাকে হাসপাতালে রেখে পুলিশ চলে যায়। আমি সেখান থেকে আমার বাসায় আসি।
জবানবন্দিতে মেহেদী হাসান আরও বলেন, পরবর্তীতে ঢাকা সিএমএইচ, সাভার সিআরপি এবং ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করি। নারায়ণা হাসপাতালে আমার হাঁটুতে দুটি অপারেশন হয়। বর্তমানে আমার আরও একটি অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে। যে নার্ভটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা কেটে সেখানে আরেকটি নার্ভ প্রতিস্থাপন করতে হবে।
পরবর্তীতে জানতে পারি, ডেইলি স্টারের একটি ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিজিবির রেদোয়ান, মেজর রাফাত, পুলিশের এডিসি রাশেদুল ও রামপুরা থানার ওসি মশিউরের নেতৃত্বে ঘটনার দিন ছাত্র-জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। এতে আমিসহ অনেকেই হতাহত হই। উক্ত ভিডিও ফুটেজে আরও দেখতে পাই, লে. কর্নেল রেদোয়ান আমাদের ওপর গুলি করছেন। পুলিশ ও বিজিবির পোশাক পরিহিত সদস্যদের গুলি করতে দেখি। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল