জবানবন্দিতে হেফাজত নেতা মুফতি শফিকুল

জঙ্গী হিসাবে স্বীকারোক্তি না দিলে টুকরা করে সমু্দ্রে ভাসিয়ে দিব

স্টাফ রিপোর্টার

জঙ্গী হিসাবে স্বীকারোক্তি না দিলে টুকরা করে সমু্দ্রে ভাসিয়ে দিব

আওয়ামী লীগের শাসনামলে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্মম নির্যাতন করা হয় হেফজত নেতা মুফতি শফিকুল ইসলামকে। এসময় তাকে বলা হয়, জঙ্গী হিসাবে স্বীকারোক্তি না দিলে কেটে টুকরা টুকরা করে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। অথবা গুম রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে, ঢাকা শহরের অধিকাংশ পাগল তাদেরই তৈরি।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে শফিকুল ইসলাম এসব কথা তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে শফিকুল বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। আমি কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাশ করেছি। আমি একজন মুফতি। একইসঙ্গে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিস বিভাগ থেকে স্নাতোকত্তোর পাশ করেছি। বর্তমানে পূর্বাচলে অবস্থিত মারকাজুস সুনান মাদরাসা ও এতিম খানার প্রিন্সিপাল ও মাদ্রাসা মসজিদের খতিবের দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি আমি হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর পল্টন জোনের সহ-সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে এশার নামাজের পড়ে পূর্বাচলের উদ্দেশ্যে রওনা হই। জাপান গার্ডেন সিটির নিকট পৌঁছালে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে আকস্মিকভাবে কিছু লোক আমাকে ঘেরাও করে ফেলে। একজন বলেন, সোজা গাড়িতে ওঠ, নইলে গুলি করে দিবো। এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে একটি গাড়িতে তোলে। গাড়িটি ছিলো একটি হায়েস মাইক্রোবাস। গাড়ির দরজা দ্রুত বন্ধ করে দেয়। এরপর গাড়িটি চলতে থাকে। তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। আমি জিজ্ঞাস করি, আপনারা কারা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? তারা একটি কাপড় দিয়ে খুব শক্ত করে আমার চোখ বেঁধে ফেলে। গাড়ির ভিতরে আরেকজন ফোন করে বলে, মামা নিয়ে আসতেছি, মেহমানদারীর ব্যবস্থা করো। এরপর আমার দুহাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়।

জবানবন্দিতে শফিকুল বলেন, একপর্যায়ে গাড়ি থামলে আমাকে একটি ছোট রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ময়লাযুক্ত দুটি কম্বল ছিলো। এরপর তারা লোহার গ্রীলের দরজা লাগিয়ে চলে যায়। আমি অপেক্ষা করতে থাকি,হয়তো তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকবে। কিন্তু সারারাত অপেক্ষা করলেও আমাকে ডাকা হয়নি। পরদিন সন্ধ্যায় একজন লোক আসলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আমাকে এখানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা অতিক্রম হলেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না কেন? আজানের শব্দ শুনে আমি সময় বুঝতে পারি। আমি তাদেরকে আরো বলি,আমার মাদ্রাসায় প্রায় ২০০ ছাত্র আছে, তাদের খাবারের জন্য মাত্র এক বস্তা চাল রেখে এসেছি। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, নয়তো ছেড়ে দেন। তখন তারা আমাকে উপহাস করে বলে, তোরাতো শহীদ হতে চাস, আর ওই ছাত্রদের খাবারের দায়িত্ব আল্লাহর, ওগুলো নিয়ে এখন আর টেনশন করে লাভ নেই, নিজের চিন্তা কর। ২-৩ দিন পর একজন এসে আমাকে বলল, রেডি হ। এরপর গাড়িতে করে আমাকে আরেক বিল্ডিংয়ের নিয়ে একটা রুমে ঢুকানো হয়। রুমটি আনুমানিক ৪ ফিট বাই ৪ ফিট হবে। চারদিকে কালো রংয়ের দেয়াল, উপরে একটি ওয়াল ফ্যান, কর্ণারে স্টিলের ইলেকট্রিক চেয়ার দেখতে পাই। এই দৃশ্য দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একজন ভিতরে প্রবেশ করে। আমাকে অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমি কোনো জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বলা হয়। তখন আমি বলি, আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না। এক পর্যায়ে লাঠি দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। আমাকে হুমকি দিয়ে বলে , এই চেয়ারে শায়েখ আব্দুর রহমান ও জসিম উদ্দিন রহমানীকে বসিয়ে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে তাদের পেট থেকে সবকিছু বের করা হয়েছে, তোকেও তাই করা হবে। আমাকে আরো বলা হয়, হয় জঙ্গি হিসাবে স্বীকারোক্তি দিবি, নয় তোকে কেটে টুকরা টুকরা করে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে।

এমপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন