বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমানের ছেলে ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী আশিক উল আকবরকে ২০১৬ সালের ২৩ মে গভীর রাতে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। পরে রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে র্যাবের কুখ্যাত বন্দিশালা আয়নাঘরে গুম রেখে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। ঝুলিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে এবং কানে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে তারা। টানা দুমাস হাত-পা ও চোখ শক্ত করে বেধে রাখার ফলে তার চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস জেলে থাকার ফলে তিন বছর পিছিয়ে পড়েন তিনি।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এসব তথ্য উঠে আসে ভুক্তভোগী আকবরের জবানবন্দিতে।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের ঘটনায় করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষী জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৩১ বছর। আমি একজন গুমের ভিকটিম। ২০১৬ সালে আমি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। তখন আমি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী ছিলাম। তৎকালীন হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতাম। ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের ডাকে আমি শাপলা চত্বরে গিয়েছিলাম। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ভারত বিরোধী বিভিন্ন লেখালিখি করতাম। ২০১৬ সালের ২৩ মে গাজীপুরে মামার বাড়ি থেকে গভীর রাতে ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারীকে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। বাড়িতে ঢুকেই তারা আমার নাম জিজ্ঞেস করে। আমি নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার মাথায় পাতলা কালো কাপড় পরিয়ে মারধর করতে করতে একটি কালো মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোতে বসিয়ে চোখ শক্তভাবে বেঁধে জমটুপি পরিয়ে দেয়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আনুমানিক এক দেড় ঘণ্টা চলার পরে মাইক্রোবাসটি একটি অজ্ঞাত স্থানে এসে দাঁড়ায়। সেখানে আমি বিমান উঠানামার শব্দ শুনতে পাই। সেখানে আমি একটি স্টিলের দরজা খোলার শব্দ পাই। এরপর একটি সেলে আমার গায়ের জামা-কাপড় খুলে পুরাতন একটি লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়। এখানে চোখ ও হাত বেধে আমাকে দুই মাস রাখা হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতে পেতাম। একদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বেধড়ক পিটিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মর্মে স্বীকারোক্তি দিতে বলে। আমি অস্বীকার করলে আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে এবং আমাকে একটি মেশিনের মাধ্যমে ঝুলানো হয়। ওজন বেশি থাকার কারণে আমার দুই হাতের বগোলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। তখন নামানো হয়। আমাকে পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসাবে স্বীকার করতে বলে। আমি অস্বীকার করলে আমার দুই কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। ইলেকট্রিক শক দেওয়ার সময় আমার মনে হয় আমি মরে যাচ্ছি (এ সময় সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)। তখন আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি এবং আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। তখন তারা একটি প্রিন্টেড কাগজ ও একটি সাদা কাগজ দেয়। আমাকে প্রিন্টেড কাগজ দেখে দেখে সাদা কাগজে লিখতে বলে। এসময় আমার পিছনে দুইজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি আরো অত্যাচারের ভয়ে প্রিন্টেড কাগজে থাকা লেখা হুবহু খুব দ্রুত সাদা কাগজে লিখি। এরপর আমার চোখের রেটিনা, ১০ আঙ্গুলের ছাপ এবং সাদা কাগজে লেখা আমার জবানবন্দির ভিডিও স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে আকবর বলেন, আমাকে আনুমানিক ৬০ দিন এই সেলে রাখা হয়। এসময় ২৪ ঘণ্টা চোখ বেঁধে এবং দুই হাত পিছনের দিকে নিয়ে হ্যান্ডকাফ বেঁধে রাখা হতো। ২৪ ঘণ্টা শক্ত করে চোখ বাঁধা থাকার কারণে ডান চোখে প্রচুর ব্যথা অনুভব করি এবং ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। পরবর্তীতে জামিনে বের হওয়ার পরে আমার ডান চোখের অপারেশন করাতে হয়। যার হাসপাতালের কাগজপত্র আমার কাছে আছে। সেখানে যা খাবার দেওয়া হতো সেটাই খেতে হতো। কেউ খেতে না চাইলে প্রচণ্ড মারধর করতো। তিন মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল শেষ করতে হতো। তিন মিনিটের বেশি হলে ওরা প্রচুর মারধর করতো। আনুমানিক ৬০ দিন পর আমাকে বলা হয় আমাকে আমার বাসায় রেখে আসবে। আমার পুরাতন জামা-কাপড় দিয়ে পরতে বলে। তারা আমার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে বলে ‘চোখ বন্ধ রাখবি, যদি চোখ খুলিস তাহলে কঠিন মাইর হবে। চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায় তারা আমার চুল কেটে দেয় এবং দাঁড়ি শেভ করে দেয়। এরপর একটি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরায় সেখানে র্যাব লেখা ছিলো। এরপর তারা আমার চোখের বাঁধন শক্ত করে দেয় এবং একটি জমটুপি পরিয়ে খুব টাইট করে রাখে। এতে আমার নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।
জবানবন্দিতে এই গুমের এই ভিক্টিম বলেন, এরপর তারা আমাকে জমটুপি পরিয়ে তার ওপর হেলমেট পরায়। তখন একটি মাইক্রোবাসে তুলে আমাকে অজ্ঞাত স্থানে দাঁড়ায়। সেসময় আমার হ্যাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। আনুমানিক ৬০ দিন পরে আমি প্রথম দিনের আলো দেখতে পাই এবং আমি দেখতে পাই অনেক ক্যামেরা আমার ছবি তুলছে। এরপর আমাকেসহ আরো তিনজন যাদের নাম যথাক্রমেÑমাহমুদুল হাসান, নাজমুস সাকিব ও শরিয়তুল্লাহ শুভকে র্যাব-১ এর মিডিয়া সেন্টারে এনে হাতের হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধ খুলে দেওয়া হয়। আমি দেখতে পাই একটি ব্যাগে করে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র, নাট-বল্টু ও বিভিন্ন প্রকার বই ব্যাগ থেকে বের করে একটি টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখা হয় এবং আমাদেরকে টেবিলের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলে। তখন আমাদের ছবি তোলা হয়। জেলখানায় থাকা অবস্থায় আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় হুবহু সেই ছবি দেখতে পাই।
এরপর পুনরায় আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে চোখ বেঁধে র্যাব-১ এর বারান্দায় ফেলে রাখা হয়। ওইদিন আনুমানিক রাত ১০ টার দিকে আমাদেরকে টঙ্গী থানায় নিয়ে আসে। তখন সে সময় টঙ্গী থানার ওসি আমার নাম শুনে কাকে জানি ফোন করে বলে , স্যার মুক্তিযোদ্ধার ছেলে আশিক উল আকবরকে আমরা খুঁজে পাই না, দেখেন স্যার র্যাব তাকে দুই মাস রেখে এখন মামলা দিতে নিয়ে এসেছে। ওসি মামলা নিতে অস্বীকার করে। পরবর্তীতে একটি ফোন আসায় তিনি মামলা গ্রহণ করেন।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, ২০১৬ সালের ২১শ জুলাই আমি সহ আরো তিন জন, মোট চার জনের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় একই ঘটনায় তিনটি মিথ্যা মামলা করা হয়। পরেরদিন আমাদেরকে আদালতে উপস্থাপন করে ৭ দিনের রিমান্ড চায়। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। রিমান্ড শেষে আমাদেরকে জেলা হাজতে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আমি ডেমরা থানার মামলা থেকে চার্জশীটে অব্যাহতি পাই। টঙ্গী থানার একটি হাইকোর্ট থেকে ২০১৭ সালে স্টে হয়ে যায় এবং আশুলিয়া থানার মামলা থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসে বেকসুর খালাস পাই। আমি ২ মাস গুম এবং ১৩ মাস জেলে থাকার পরে হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্ত হই।
এই ঘটনার ফলে আমার মেডিকেলে পড়াশোনা তিন বছর পিছিয়ে যায়। পরে আমি ২০২৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করি। আমি আমার উপরে হওয়া এই ঘৃণ্য নির্যাতনের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী, তার ফ্যাসিস্ট রেজিমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওই সময়ের র্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


